Main Menu

নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক: ভুল সমীক্ষায় বেড়েছে ১৮৩ কোটি টাকা

[Web-Dorado_Zoom]
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রস্তুত না করেই কাজ শুরু করায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ১৮৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একই সঙ্গে আট বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৪২১ কোটি ৪৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। পরে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০৪ কোটি ৮৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৫২ শতাংশ বা ১৮৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল নবীনগর-আশুগঞ্জ অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা। সড়কটি নির্মিত হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঢাকা যেতে দীর্ঘ পথ ঘুরতে হবে না।
### আট বছরেও শেষ হয়নি কাজ
প্রকল্পটির মূল বাস্তবায়নকাল ছিল তিন বছর। ২০২১ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চার দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৬৭ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ। তবে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প শুরুর আগে মাটির গুণাগুণ ও ভিত্তি সম্পর্কে যথাযথ সমীক্ষা করা হয়নি। ফলে বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে মাটি ও ভিত্তির নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এ কারণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগসহ অতিরিক্ত কাজ ও ব্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
### পাঁচ গুণ বেড়েছে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয়
সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৭৩ হেক্টর থেকে বাড়িয়ে ৩৪ দশমিক ৯৬ হেক্টর করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ৬০ কোটি ২২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২৯৬ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আইএমইডি বলছে, সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশায় ত্রুটির পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের ভুল হিসাবও প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
### নির্মাণকাজেও নানা ঘাটতি
পরিবীক্ষণ দল সরেজমিন পরিদর্শনে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি, পরিমাণ ও গুণগত মানে বিভিন্ন ঘাটতি পেয়েছে। ফুটপাত, আরসিসি ইউ-ড্রেন ও সসার ড্রেন নির্মাণে নির্ধারিত শর্ত ও বিল অব কোয়ান্টিটিজ (বিওকিউ) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান যাচাইয়ে ল্যাবরেটরি টেস্টিং ব্যবস্থাতেও সীমাবদ্ধতা ও অবহেলার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, ট্রাফিক সাইন এবং ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরেও ঘাটতি পাওয়া গেছে।
প্রকল্পের পাঁচটি প্রধান প্যাকেজের মধ্যে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় অন্যান্য কাজেও এর প্রভাব পড়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা নিয়মিত না হওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
### প্রায় ৫৪ কোটি টাকার অডিট আপত্তি
প্রকল্পটিতে মোট ৫৩ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে। এর মধ্যে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ও ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ না করেই ৪৯ কোটি ৯ লাখ ৮১ হাজার ৪২৭ টাকার কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র সম্পাদন ও বাতিলের বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া ইউটিলিটি স্থানান্তরের জন্য দেওয়া অগ্রিম বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে কর্তন না করায় সরকারের ৩ কোটি ৭২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫১ টাকা আর্থিক ক্ষতির বিষয়ও অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
### দুর্ভোগে স্থানীয়রা
সড়কটির নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে চললেও এখনো পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় স্থানীয়দের দুর্ভোগ কমছে না। ধুলাবালু, ভাঙাচোরা সড়ক ও বিকল্প পথে চলাচলের কারণে সময় ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। কৃষিপণ্য পরিবহনেও সমস্যায় পড়ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
নবীনগরের এক কৃষক বলেন, সড়কের কাজ ধীরগতিতে চলায় এলাকার মানুষকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নিতে না পারায় তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
### বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার সুপারিশ
প্রকল্পটি দ্রুত ও টেকসইভাবে শেষ করতে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা ও রোডম্যাপ তৈরির সুপারিশ করেছে আইএমইডি। একই সঙ্গে নিয়মিত ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রীর মান নিশ্চিত এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউনুস আলী সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশায় ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, তিন বছরের প্রকল্প বাস্তবায়নে আট বছর লেগেছে। এখনো ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। তবে ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হলে ঠিকাদারদের কাজ শেষ করতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রকল্পের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। কাজ যাতে দ্রুত শেষ হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে হবে।





Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

This site is protected by wp-copyrightpro.com

Shares