Main Menu

একজন মানবকর্মী ইধির মহাপ্রয়ান

[Web-Dorado_Zoom]

shahaziz1957-1468074745-e27f278_xlargeডেস্ক ২৪:: মূল নাম আব্দুল সাত্তার ইধি হলেও পাকিস্তানের আম জনতার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ইধি ফাউন্ডেশনের ‘ইধি সাহেব‘ নামেই। ৮৮ বছর বয়সে শুক্রবার রাতে ইহলোক ছেড়ে পাড়ি জমান অন্যলোকের উদ্দেশে। তবে যাওয়ার আগে রেখে গেলেন বিশাল এক কর্মময় জীবন। যে কোনো মাপকাঠিতেই যা মানবতার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

১৯৫১ সালে করাচির জনবহুল এক গলিতে শুরু করেন নিজের প্রথম ক্লিনিক। সেই থেকে শুরু। পাকিস্তানজুড়ে একে একে গড়ে তোলেন এতিম খানা, অসহায় নারীদের আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল, ডিসপেনসারি, মর্গ, কবরস্থান এরকম আরও বহু জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এধি ফাউন্ডেশন সবচেয়ে খ্যাতি পায় তাদের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের জন্যই। পাকিস্তানে যে কোনো বোমা বিস্ফোরণ কিংবা সহিংসতার ঘটনার পর টেলিভিশন খুললেই দেখা যেত হতাহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে ছোটাছুটি করছে ইধি ফাউন্ডেশনের ছোটো ছোটো অ্যাম্বুলেন্সগুলো।

ইধি ফাউন্ডেশনের প্রায় দেড় হাজার অ্যাম্বুলেন্সের এই বহর গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস।

নির্লোভ, সাধাসিধে ফকিরের মত জীবন যাপনের কারণে পাকিস্তানে অনেকে তাকে ডাকতেন জিন্দা পীর নামেও। দরিদ্র, অসহায় ও আশ্রয়হীনদের জন্য যার দরদ ও সেবাপরায়নতার তুলনা চলে হয়তো একমাত্র মাদার তেরেসার সঙ্গেই।

ব্যক্তি জীবনে নাম যশ কিংবা খ্যাতির তাড়নায় কখনও ভোগেননি ইধি সাহেব। পরিধেয় বলতে মাত্র দুই সেট কাপড়। ঘুমোতেন করাচিতে এধি ফাউন্ডেশনের হেডকোয়ার্টার লাগোয়ো একটি জানালাহীন ছোট্ট ঘরে। আসবাব বলতে ঘরটিতে ছিলো শুধু একটি ছোট্ট বিছানা আর হাতমুখ ধোয়ার একটি সিংক।

তার প্রতিষ্ঠিত আশ্রয়কেন্দ্রে হাজার হাজার এতিম শিশু ও অসহায় নারী আশ্রয় পেলেও নিজের ছেলেমেয়েদের জন্য কোনো ঘর রেখে যেতে পারেননি তিনি।

শুধু পাকিস্তানই নয়, তার প্রতিষ্ঠিত ইধি ফাউন্ডেশন জনসেবামূলক কাজ করেছে বাংলাদেশ আফগানিস্তান, ইরান, শ্রীলঙ্কা, ক্রোয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এমনকি সুদূর আমেরিকার হারিকেন ক্যাটরিনা উপদ্রুত অঞ্চলেও।

ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে অসহায় মানুষের সেবায় নিবেদিত ছিলেন ইধি সাহেব। তার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অসহায়দের সেবা পেতে ধর্ম কখনই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
পাকিস্তানে যখন জঙ্গিবাদের বাড় বাড়ন্ত তখনই তার সাহসী উচ্চারণ ছিলো, ‘আমার কাছে মানবতার থেকে বড় কোনো ধর্ম নেই’।

২০১৩ সালে কিডনি রোগ ধরা পড়েছিলো ইধি সাহেবের। চিকিৎসাধীন ছিলেন করাচির সিন্ধ ইন্সটিটিউট অব ইউরোলজি অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্টেশনে।

চিকিৎসার জন্য বহুবার তাকে বিদেশে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলো পাকিস্তানি সরকার। কিন্তু প্রত্যেকবারই বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তার চিকিৎসা হবে পাকিস্তানে এবং তাও হবে একমাত্র সরকারি হাসপাতালেই।

পরিহিত কাপড়েই যেন তাকে সমাহিত করা হয় মৃত্যুর আগে এই ছিলো তার শেষ ইচ্ছা।শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গও দান করে গিয়েছিলেন তিনি।

আব্দুল সাত্তার ইধির মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন পুরো পাকিস্তান। শোক আছড়ে পড়েছে সীমান্তের ওপাশে ভারতেও। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বার্তা পাঠিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। এছাড়া ভারতের প্রায় সবগুলো সংবাদমাধ্যমেই গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয় তার মৃত্যুর সংবাদ।

ইধি সাহেব জন্মেছিলেন ১৯২৮ সালে অবিভক্ত ভারতের গুজরাটে এক ব্যবসায়ী পরিবারে। ৪৭ এর দেশভাগের সময় করাচিতে আবাস গড়ে তোলে ইধির পরিবার। কিন্তু দেশভাগের উত্তাল সময়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা যান ইধির পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা। মায়ের এই অসহায় মৃত্যুই মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করে ইধিকে।

ইধি সাহেবের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিলো, ‘মানুষকে ভালোবাসাই আমার উদ্দেশ্য, তাই প্রতিটি দিনই আমার শ্রেষ্ঠ দিন।’

মানবসেবার জন্য ১৯৮৬ সালেই তাকে ভূষিত করা হয় এশিয়ার নোবেল হিসেবে পরিচিত র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারে। বহুবার আলোচনায় আসলেও অবশ্য তাকে পুরস্কারের জন্য যোগ্য বিবেচনা করেনি নোবেল কমিটি। এ ব্যাপারে আক্ষেপও ছিলো না তার। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাছে নোবেল পুরস্কারের কোনো মূল্য নেই, আমি চাই মানুষ, আমি চাই মানবতা’। ইধি সাহেব পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনের হুমকির শিকার হওয়ার পর পাকিস্তান ছেড়ে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বেশ কবছর পছর পর আবারো তার কাজ শুরু করেন।

শনিবার জোহর নামাজের পর অনুষ্ঠিত জানাজায় তাকে গার্ড অব অনার দেয় পাকিস্তানি সেনারা। এ সময় ১৯ বার তোপধ্বনি দেয়া হয়।

করাচির একটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই জানাজায় হাজার হাজার মানুষের পাশাপাশি অংশ নেন সেনাপ্রধান রাহিল শরীফসহ পাকিস্তানের তিন বাহিনীর প্রধান, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মামনুন হোসেইন।

হাসপাতালে ভর্তি থাকায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ জানাজায় না থাকতে পারলেও উপস্থিত ছিলেন তার ভাই ও পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ, সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী কায়েম আলি শাহ সহ পাকিস্তানের সরকার, প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।

নিজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হলেও তিনি অন্তত একবারের জন্য একত্রিত করতে পেরেছেন রাজনৈতিক, ধর্মীয় সহিংসতা এবং হানাহানিতে বিপর্যস্ত পাকিস্তানের সব পক্ষকে। মানবসেবায় জীবন উৎসর্গ করার পাশাপাশি এটাই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

This site is protected by wp-copyrightpro.com

Shares