ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মহিদুল ব্যস্ত ছিলেন অন্য কাজে

অস্ত্রের ঝনঝনানি,একের পর এক খুন। লাগাতার দাঙ্গা-ফ্যাসাদ। চারদিকে মাদক আর মাদক। চুরি-ডাকাতিতে অতিষ্ঠ মানুষ। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের গোয়েন্দা রিপোর্টে এসবের কোনো কিছুই উঠে আসেনি। জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় উপস্থাপিত পুলিশের প্রতিবেদনে চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের কলাম সব সময় থেকেছে ফাঁকা। ভেরিফিকেশন ছাড়াও এলাকায় গোয়েন্দা কাজের দায়িত্ব পুলিশের বিশেষ শাখার। অপরাধের বিস্তার বা সামগ্রিক অবস্থার রিপোর্ট করবে তারা। আইনশৃঙ্খলা বেহাল অবস্থায় ভেসে যেতে থাকলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশের বিশেষ শাখা ব্যস্ত থেকেছে অন্য কাজে। বিশেষ শাখার এক ইন্সপেক্টর হয়ে ওঠেন জেলা পুলিশের হর্তাকর্তা। আলোচিত এই ইন্সপেক্টর জেলা ইন্টেলিজেন্স অফিসার-১ (ডিআইও-১) মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম। তার বিপি নম্বর ৭৯০৬১১৮১০৪। প্রায় এক বছর ডিআইও-১ পদে দায়িত্ব পালনকালে জেলায় পুলিশের ক্ষোভের কেন্দ্র হয়ে ওঠেন মহিদুল। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশকে নষ্ট করেছে সে। পুলিশ সুপার মো. এহতেশামুল হকের বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন মহিদুল। এসপি চলতেন তার কথায়। মহিদুল খুশিতো এসপি খুশি। সে কারণে সবাই মহিদুলকে সমঝে চলেছেন। এসপিকে সামনে রেখে নেপথ্যে থেকে সব করেছেন মহিদুল।
জেলা পুলিশে এমনই আলোচনা। এসপি’র বদলির সঙ্গে সঙ্গে জেলা থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছেন মহিদুলও। তার হাতে নানাভাবে হয়রানির শিকার পুলিশ কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা থেকে দ্রুত বদলির ব্যবস্থা করিয়েছেন বলেও আলোচনা রয়েছে। গত ২৬শে নভেম্বর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে ৭৩ জন ইন্সপেক্টরের বদলি আদেশ হয়। এতে মহিদুলের নাম রয়েছে ৩০ নম্বর ক্রমিকে। তাকে রংপুর রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। এসপি’র বদলির পরই তার অপকর্ম নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন জেলায় কর্মরত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা। গত একবছর জেলার আইনশৃঙ্খলা বাজে অবস্থায় পৌঁছানোর পেছনে ডিআইও-১ হিসেবে মহিদুলের রয়েছে বিরাট দায়, ব্যর্থতা। গোয়েন্দা রিপোর্ট দেয়ার পরিবর্তে নিজের আখের গোছাতেই কাজ করেছেন দিনরাত। প্রতি থানা থেকে মাসোহারা আদায় করা ছিল তার প্রধান কাজ। এজন্য জেলার ৯ থানায় নিজস্ব লোকদের নিয়োজিত করেন। প্রত্যেক থানার কম্পিউটার অপারেটররা মহিদুলের হয়ে কাজ করেন। এ ছাড়া, আখাউড়া থানার ওসি ছমি উদ্দিন, ইমিগ্রেশনের ইনচার্জ আবদুস সাত্তার মহিদুলের ব্যাচমেট। আখাউড়া ইমিগ্রেশনের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে মহিদুল এসপি’র মাধ্যমে নির্দেশ দিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করান। মামলার বাদী হন ইমিগ্রেশন ইনচার্জ সাত্তার নিজেই। কিন্তু ইমিগ্রেশন ওসি’র বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে আসা অভিযোগের আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত হয়নি। সাংবাদিকরা যাতে পুলিশের অপকর্ম নিয়ে লেখালেখি থেকে দূরে থাকে সেজন্য তাদের থামিয়ে রাখতে গোপন রিপোর্ট পাঠিয়ে হয়রানিতে ফেলার চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, জেলা পুলিশের এসব অপকর্ম নিয়ে আইনশৃঙ্খলা সভাসহ বিভিন্ন ফোরামে যারা কথা বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে গোপন রিপোর্ট তৈরি করে বিশেষ পুলিশ সুপারের স্বাক্ষরে ঢাকায় পাঠানো হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, মহিদুলের ইঙ্গিতে জেলার বিভিন্ন থানায় অফিসাররা বসতেই পারেননি। কারণে-অকারণে চলে বদলি। ফলে জেলায় ওয়ারেন্ট তামিল একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এই সময়ে ডিএসবি ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাউকে বদলি করা হয়নি।
শুধু থানা থেকে মাসোহারা আদায় করাই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানাস্থ পুলিশ ক্লাবের নিচতলার কক্ষও ভাড়া দিয়েছেন মহিদুল। প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে ভাড়া আদায় করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ক্লাবের দু’টি কক্ষে নিজের লোকজন বসিয়ে থানায় আধিপত্য ছাড়াও নিজের অপকর্ম চালান। থানা ছাড়াও পুলিশ লাইনেও নিজের লোক বসিয়ে কব্জা করেন মহিদুল। তার হয়ে এএসআই রবিউল পুলিশ লাইন নিয়ন্ত্রণ করতেন। পুলিশ লাইনের সব কেনাকাটার দায়িত্ব ছিল রবিউলের। প্রশাসনিক কারণে একাধিকবার রবিউলের বদলি আদেশ হলেও সেটি মহিদুল ঠেকিয়ে দেন। আরআই ফখরুলও মহিদুলের লোক হিসেবে পরিচিত।
এ বিষয়ে কথা বলতে মহিদুল ইসলামের সরকারি ও ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাননি। একজন সাংবাদিকের ফোন রিসিভ করে তিনি বলেন, ফোনে কোনো কিছু বলা যায় না। কবে আসবেন বলেন।
নিউজটি মানবজমিনে প্রকাশিত



















