বাঞ্ছারামপুরে মসজিদে মহিলাদের নামাজ ও বিশ্রামের সুব্যবস্থা: সৃজনশীল, যুগান্তকারী ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ
[Web-Dorado_Zoom]
একটি আধুনিক, মানবিক ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সমাজের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক, মৌলিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যেখানে নারী, সেখানে জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদগুলোতে তাদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও ধর্মীয় অনুশাসন পালনের বিষয়টি অগ্রাধিকারে থাকা উচিত। এই বাস্তবতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা সদরে নারীদের জন্য নামাজ, ওযু ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করার যে দূরদর্শী উদ্যোগ উপজেলা প্রশাসন ও মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি গ্রহণ করেছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং প্রশংসার দাবিদার। উপজেলা প্রশাসন মসজিদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় এই ব্যবস্থা করার যৌথ সিদ্ধান্ত বাঞ্ছারামপুরের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের একটি নীরব কষ্টের অবসান ঘটাতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মোঃ তারিকুল ইসলাম এর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে অবগত হয়ে ভালো লাগলো তাই জনস্বার্থে এই লেখা।
আমাদের মহান সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বর্ণিত অনুচ্ছেদ ১৫ (জনগণের মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা), অনুচ্ছেদ ১৮ (জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার উন্নয়ন) এবং অনুচ্ছেদ ১৯ (নারীদের সুযোগের সমতা ও বৈষম্যহীনতা) এর প্রেরণাকে ধারণ করে যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা কেবল তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নই করবে না, বরং সংবিধানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও স্পিরিট বাস্তবায়নেও এক অনন্য ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা সদরে প্রতিদিন সরকারি-বেসরকারি অফিস, চিকিৎসা, আইনি কাজ এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনে শত শত নারী ও শিশুর যাতায়াত ঘটে। বিশেষ করে, পাশেই সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং এর আশপাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর কারণে এই এলাকাটিতে নারীদের, বিশেষ করে গর্ভবতী ও অসুস্থ মায়েদের উপস্থিতি সবসময়ই বেশি থাকে। মেডিকেল পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য বা ডাক্তারের সিরিয়ালের জন্য তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু এতোদিন এই বিস্তীর্ণ সদর এলাকায় নারীদের জন্য কোনো নিরাপদ ওয়াশরুম, ওযুখানা বা নামাজের সুব্যবস্থা ছিল না। বাধ্য হয়ে অনেককে আশেপাশের অপরিচিত মানুষের বাড়িঘরে যেতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত বিব্রতকর। অনেকেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সময়মতো নামাজ পড়তে পারতেন না।
উপজেলা প্রশাসনের এই নতুন উদ্যোগে শুধু ওযু বা নামাজের স্থানই থাকছে না, বরং যুক্ত হচ্ছে আধুনিক নাগরিক সুবিধা। মসজিদের দ্বিতীয় তলায় পার্টিশন দেয়াল দিয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি নামাজের জায়গা গড়ে তোলা হয়েছে নারীদের জন্য। দীর্ঘ প্রতীক্ষায় ক্লান্ত মানুষের জন্য থাকছে সুপেয় পানির ব্যবস্থা, হাইকমোডসহ পরিচ্ছন্ন বাথরুম এবং আরামদায়ক ওযুখানা। যুক্ত হয়েছে সময়ের দাবি মেটানো দুটি সুবিধা; মোবাইল চার্জিং পয়েন্ট ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার। প্রবাসী স্বজনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা কিংবা হাসপাতালে আসা রোগীর সন্তানকে স্তন্যদানের মতো অতি বাস্তব প্রয়োজনগুলো যে পরিকল্পনায় স্থান পেয়েছে, তা এই উদ্যোগের গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রমাণ। নিরাপত্তা ও শালীনতা রক্ষায়ও রাখা হয়েছে সুচিন্তিত ব্যবস্থা, নারীদের জন্য দক্ষিণ গেট, পুরুষদের জন্য উত্তর গেট নির্ধারণ করে কোনোরকম বিশৃঙ্খলা ছাড়াই একটি স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সর্বত্র সৃজনশীলতা ও চিন্তার ছাপ স্পষ্ট!
ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ কখনোই কেবল পুরুষের জন্য সংরক্ষিত স্থান ছিল না। মদিনার মসজিদে নারীদের নামাজের জন্য পৃথক কাতারের ব্যবস্থা স্বয়ং নবীজির যুগ থেকেই প্রচলিত, আর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে নারীদের মসজিদে আসতে নিরুৎসাহিত করার কোনো নির্দেশনা তিনি দেননি। এ কারণেই পবিত্র মক্কা-মদিনাসহ ইরান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে মসজিদে নারীদের জন্য পৃথক ও সুরক্ষিত ব্যবস্থা থাকা রীতিমতো একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য। এমনকি আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো অমুসলিম-প্রধান দেশগুলোর মসজিদেও নারীদের জন্য অত্যাধুনিক ও নিরাপদ নামাজের ব্যবস্থা রাখা হয় নিয়মিতভাবে।
আমাদের নিজস্ব জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমেও রয়েছে নারীদের জন্য প্রশস্ত ও পৃথক নামাজ-ওযুর ব্যবস্থা। বাঞ্ছারামপুর তাই কোনো ব্যতিক্রমী পথ তৈরি করছে না, বরং একটি সুপ্রাচীন ও সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহ্যের সাথে নিজেকে যুক্ত করছে মাত্র। বৈশ্বিক ও জাতীয় সংস্কৃতিতে এগিয়ে রাখার এমন প্রকল্পের জন্য যুগ যুগ ধরে আমরা গর্বিত হব। বাঞ্ছারামপুর উপজেলা মসজিদ বৈশ্বিক ও জাতীয় সংস্কৃতিরই একটি চমৎকার অংশ হতে যাচ্ছে যা আমাদের জন্য গর্বের ও গৌরবের।
যাঁরা প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের প্রতি
জনকল্যাণমূলক এমন উদ্যোগের বিষয়ে নিরর্থক বা নির্বোধ সমালোচনা হতে পারে! কেউ কেউ একে “অপ্রয়োজনীয় ব্যয়” বলবেন, কেউবা “নতুন সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ” বলে সংশয় প্রকাশ করবেন। কেউ কেউ ধর্মীয় মাসালা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারেন, বলতে পারেন বিদায়াত! কিন্তু ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য উভয়ই বলে দেয়, নারীর জন্য মসজিদে সম্মানজনক স্থান নিশ্চিত করা কোনো নতুন আমদানি নয়, বরং একটি ভুলে যাওয়া দায়িত্বের পুনরুদ্ধার মাত্র। যে সমাজ তার মা-বোনদের একান্ত প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্নে দ্বিধায় ভোগে, সে সমাজ নিজের অগ্রগতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাঞ্ছারামপুরের এই উদ্যোগ তাই কোনো তর্কের জবাব শব্দে দেয় না! দেয় নির্মাণে, বাস্তবায়নে, নীরব অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে। প্রকৃত জনকল্যাণ কখনো তর্ক দিয়ে প্রমাণ করতে হয় না; তা প্রমাণিত হয় তার ব্যবহারিক ফলাফলে, ভালোবাসায়, মানুষের মুখের হাসিতে।
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই উদ্যোগকে বাঞ্ছারামপুরের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাগত জানিয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে এই উদ্যোগের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এলাকার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ।
এ বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সর্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতা, সাবেক ডিআইজি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সমিতির সভাপতি, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সফল সংসদ সদস্য জনাব
এম.এ. খালেক (পিএসসি) তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন: “আমাদের মা-বোনদের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রশংসনীয়। রাজনীতি ও মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের কল্যাণে এমন উদ্যোগ বাঞ্ছারামপুরকে আরও সমৃদ্ধ করবে।”
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক সিকদার ও অ্যাডভোকেট জিয়াউদ্দিন জিয়া যৌথ বিবৃতিতে বলেন: “নারীদের পর্দা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অনুশাসন পালনের এই মহৎ প্রচেষ্টাকে আমরা স্বাগত জানাই। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের ভোগান্তি দূর করতে এটি অতুলনীয় ভূমিকা রাখবে।”
সামাজিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ঢাকাস্থ বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কল্যাণ সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব মোহাম্মদ মোফাককের এবং সাধারণ সম্পাদক মেজর সাঈদ (অব:) বলেন: “এটি বাঞ্ছারামপুরের আপামর জনতার দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। প্রশাসন ও মসজিদ কমিটিকে আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমরা এই ব্যবস্থার স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণেও পাশে থাকব।”
নেতৃত্ব ও মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও জনকল্যাণের প্রশ্নে বাঞ্ছারামপুরের এই ঐক্যবদ্ধ সমর্থন এবং উপজেলা প্রশাসন ও মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির এই যৌথ প্রচেষ্টা সত্যিই এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকরণে এই দূরদর্শী যাত্রা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে, এটাই বাঞ্ছারামপুরের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা। বাঞ্ছারামপুরের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ তাই কেবল একটি মসজিদ সংস্কার নয়; এ এক নীরব বিপ্লব, যা প্রমাণ করে দেয়, ইচ্ছা থাকলে, সদিচ্ছা থাকলে, প্রশাসন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান একসাথে হাত মিলিয়ে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
এই প্রকল্পটি নারী ও শিশুদের কল্যাণে একটি সৃজনশীল ও সফল প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মনে করি। একটি জনবান্ধব ও মানবিক উদ্যোগের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আবারও
আন্তরিক অভিনন্দন!
বিনীত; অ্যাডভোকেট মীর হালিম
অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি-জেনারেল ফর বাংলাদেশ
দপ্তর সম্পাদক; বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কল্যাণ সমিতি, ঢাকা।
« আশুগঞ্জে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে ছিল পুকুরে, ফুটবল খেলার পর গোসলে নেমে প্রাণ গেল দুই মাদ্রাসা ছাত্রের (Previous News)



















