Main Menu

আশুগঞ্জে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর স্মরণে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ উদ্বোধন, টিকিটের মূল্য ২০ ও ৩০ টাকা

[Web-Dorado_Zoom]

একাত্তরের সেই রক্তঝরা দিনগুলোর স্মৃতি আজও যেন জীবন্ত হয়ে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায়। দেয়ালে দেয়ালে যুদ্ধের বিভীষিকা, স্বজন হারানোর বেদনা, দেশ ছাড়ার অসহায়ত্ব আর বিজয়ের মুহূর্তের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি ও আত্মদানকারী ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মরণে ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ অবশেষে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

একাত্তরের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস ও বাঙালির বিজয়ের গল্প এবার আরও কাছে থেকে দেখার সুযোগ পাবেন নতুন প্রজন্মসহ সাধারণ মানুষ। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পর আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করেন জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউরা এলাকায় ৩ দশমিক ৬১ একর জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে এই ‘মৈত্রীস্তম্ভ’। ২০১৭ সালে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ কোটি টাকা। কয়েক দফা মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও মুক্তিযুদ্ধের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও স্মৃতি উঠে আসা এই স্মৃতিস্তম্ভ এত দিন সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি।

প্রকল্পের ব্যয় ও নির্মাণ

জানা গেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৭ সালে আশুগঞ্জে ‘মৈত্রীস্তম্ভ’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার সময়ও নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৪৭ কোটি টাকা করা হয়। এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হয়নি। পরে ব্যয় বাড়িয়ে ৭২ কোটি টাকা করা হয়। শেষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। তখন ক্ষমতায় ছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর অবদান

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। তারপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সৈন্যরাও যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধে সীমান্ত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকেই চোখে পড়ে আশুগঞ্জের কামাউরা এলাকায় ‘মৈত্রীস্তম্ভ’। প্রবেশের দুটি ফটক, ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে পশ্চিমাংশে দেয়ালে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খোদাই করা চিত্র। সেখানে সিকান্‌দার আবু জাফরের কবিতা থেকে লেখা ‘আমার কাঁধেই নিলাম তুলে তোমার যত বোঝা, তুমি আমার বাতাস থেকে মুছো তোমার ধুলো, তুমি বাংলা ছাড়ো’। পাশেই খোদাই করা লেখা রয়েছে ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম’, ‘জয় বাংলা’ ও ‘এ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে’।

দক্ষিণ দিকের পার্কের পশ্চিমাংশে দেয়ালে ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের শিকল, কারাগারের বন্দিদশা, ১৯৬২ সালের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের প্রতিবাদ, জাতীয় নেতাসহ নানান ছবি খোদাই করা হয়েছে। দক্ষিণ দিকের পার্কের পূর্ব পাশের অস্ত্র হাতে মিত্রবাহিনীসহ তাঁদের হেলিকপ্টার-যুদ্ধবিমান-গোলাবর্ষণের অস্ত্র ও ট্যাংক এবং রেডিও ও অস্ত্র হাতে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের নানান চিত্র।

মূল স্মৃতিস্তম্ভের নিচের চারপাশে ব্রোঞ্জে (পিতল) লেখা আছে মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সেনাসদস্যদের নাম। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ১ হাজার ৪৮২ জন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদের সদস্য, ভারতীয় ইস্টার্ন থিয়েটার সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ২৯ জন সদস্য, ভারতীয় ইস্টার্ন থিয়েটার বিমানবাহিনীর ১১ জন, ভারতীয় নৌবাহিনীর ৬ জন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৯ জন কর্মকর্তা ও জেসিও পর্যায়ের ৭০ জন সদস্যের নাম।

প্রকল্পের দুটি ফটকের মাঝখানে ভেতরে একটি পানির ফোয়ারা, স্মৃতিস্তম্ভের পশ্চিমাংশে ৮টি এবং পূর্ব পাশে ১০টি এবং স্মৃতিস্তম্ভের পেছনে ১৪টি দোকান (ফুড কোর্ট) ও একটি রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের নিচের অফিস ও সংগ্রহশালা বা জাদুঘর এবং পেছনে শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্ক রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণপূর্ত বিভাগ স্মৃতিস্তম্ভ ও শিশুদের জন্য নির্মিত পার্কটি ২০২৪ সালে আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ভেতরে ২৭টি দোকানসহ এর রক্ষণাবেক্ষণে মাসে প্রায় আট লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডেভেলপারস সূত্রে জানা গেছে, স্মৃতিস্তম্ভের ভেতরে কার্পেট খাস, বিভিন্ন ধরনের হেজ (দেয়ালের ওপর সবুজ ঘাস), রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া ও সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, এটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু সবাই একত্র হতে পারছে না। আর সাধারণ মানুষ এটি দেখার জন্য ভীষণ উৎসাহী। পাশাপাশি ধুলাবালু পড়ে এটি নষ্ট হচ্ছে। তাই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এটি খুলে দেওয়া হয়েছে। আপাতত মানুষের প্রবেশমূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইজারা দেওয়া হবে অথবা প্রশাসন নিজেই এটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।

হন।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

This site is protected by wp-copyrightpro.com

Shares