Main Menu

পারিবারিক শিক্ষা

[Web-Dorado_Zoom]

প্রতিটি সমাজেই পরিবার হলো শিশুদের সামাজিকভাবে গড়ে ওঠার একটি প্রাথমিক ও প্রধান শিক্ষালয়। একটি মৌল প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবার শিশুদেরকে সুষ্ঠুভাবে লালন পালন, তাদের সুন্দর অভ্যাস গঠন, তাদের আচার-আচরণে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ তৈরী করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিজ পরিবারের সদস্য অর্থাৎ বাবা-মা, ভাই-বোন ও অন্যান্য নিকটাত্মীয়ের সাথে শিশুর ব্যবহার ও আচরণ কেমন হবে তা পারিবারিক পরিবেশেই শিশুরা শিখে থাকে। এছাড়া পরিবারের বাইরের আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও পরিবার মুখ্য ভূমিকা পালন করে। শিশুদের শিক্ষার হাতে খড়ি হয় পরিবার থেকেই। বিদ্যালয়ে যাবার পূর্ব পর্যন্ত নিজ গৃহেই শিশু সমাজ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে অনেক কিছু শিখে ফেলে। শিশুর কৌতুহলী মন যা দেখে সেটা সম্পর্কে জানতে চায়। স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে জানার ও চেনার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। অভিবাবকগণকে অনেক ধৈর্যের সাথে শিশুকে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। তবে কোন ভুল উত্তর শিশুর মনে ভুল ধারণার সৃষ্টি করতে পারে। এভাবেই পরিবারে শিশুরা প্রয়োজনীয় অনেক বিষয়ে সচেতনতা লাভ করে এবং একজন শিশু সামাজিক মানুষ হিসেবে বড় হয়। প্রত্যেক সমাজই শিশুর নৈতিক চরিত্র গঠন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তাকে গড়ে তোলার ব্যাপারে সচেষ্ট। নৈতিক শিক্ষা পারিবারিক শিক্ষার একটি বড় দিক। নৈতিক শিক্ষা শিশুর মধ্যে সৎ গুণাবলীর সঞ্চার করে। এসব সৎ গুণ তার ভবিষ্যত জীবনকে সুন্দর করে তোলে। তখন সে সমাজ, দেশ ও জাতিকে অনেক ভাল কিছু উপহার দিতে সক্ষম হয়, মানবতা তার দ্বারা উপকৃত হয়।
সমাজিক জীব হিসেবে মানুষ কিভাবে বসবাস করবে নৈতিক শিক্ষা তাকে সে জ্ঞানই দেয়। প্রতিটি সমাজেরই একটি নীতিবোধ রয়েছে। অভিভাবকগণ সেই নীতিবোধকেই শিশুদের অন্তরে প্রজ্জ্বলিত করে দেন। শিশু যখন পরিবারের গন্ডীর বাইরে বিদ্যালয়ে যাতায়াত শুরু করে তখন শিক্ষকগণ সে দায়িত্ব পালন করেন। নৈতিক শিক্ষা যখন ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে তখন তা সহনশীলতা ও ন্যায়বোধের দ্বারা পরিচালিত হতে হবে যাতে অন্য সম্প্রদায়ের নীতিবোধে আঘাত না লাগে। কোনটা ভাল কোনটা মন্দ তা শেখানোর জন্য শিশুরকে নৈতিক শিক্ষা দান প্রয়োজন। এই শিক্ষা তার বিবেকবোধকে জাগ্রত করে। সত্য কথন, পরপোকার, দয়া, দানশীলতা, স্নেহ-মমতা, ভক্তি-শ্রদ্ধা, সহমর্মীতা, ক্ষমা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, সম্প্রীতি ও ভালবাসা, ন্যায়নিষ্ঠা, ভদ্রতা, শিষ্ঠতা, শালীনতা, বিনয়, সুন্দর আচরণ, এরকম আরো অনেক নৈতিক গুণ বিশ্বজনীন এবং সব ধর্ম ও সমাজেই ভাল হিসেবে স্বীকৃত ও সমাদৃত। আর এ বিপরীতগুলো মন্দ ও পরিত্যাজ্য। ধর্মীয় অনুশাসন বিশেষ করে বিশ্ব স্রষ্টাকে জানা ও তাঁর প্রতি প্রেম-ভালবাসা, ভক্তি ও শ্রদ্ধা এবং সৎকাজ দ্বারা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন ও মন্দ কাজ দ্বারা তাঁর বিরাগভাজন প্রভৃতি বিষয়গুলো শিশু তার পরিবার থেকেই শিক্ষা লাভ করতে শুরু করে। এভাবেই পারিবারিক শিক্ষা শিশুকে ভবিষ্যতের একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ভূমিকা পালন করে।
আজকাল আমাদের পরিবারে শিশুরা বড় হয়ে ওঠছে ঠিকই, তবে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠতে পারছে না। শিশুদেরকে যেভাবে আদব-কায়দা শিক্ষা দেওয়া দরকার আমাদের উদাসীনতার কারণে তারা সেগুলো শিখতে পারে না। এছাড়া আমরা বড়রা ঘরে অনেক সময় মিথ্যাচার করে থাকি, এমনকি শিশুদের সাথেও। ফলে শিশুরা অনৈতিক কাজকে স্বাভাবিক হিসেকে গ্রহণ করে নিজেরাও মিথ্যাচার রপ্ত করে ফেলে। আমরা তাদেরকে অনেক সময় ভাল উপদেশ দেই যা আমরা নিজেরাই পালন করি না। আমরা তাদের সাথে যেসব ওয়াদা করি তা পালন করার সময় আমাদের থাকে না। এর প্রধান কারণ আমাদের অর্থনৈতিক ব্যস্ততা। দিনের একটা বড় সময় বাবা-মা উভয়েই অর্থের পিছনে দৌঁড়াচ্ছে আর শিশুরা নিঃসঙ্গ পরিবেশে অথবা বুয়াদের সংস্পর্শে বড় হচ্ছে। দিন শেষে ক্লান্ত বাবা-মা ঘরসংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, শিশুর দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় কমই পায়। ঘরে শিশুরা অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে। টিভি কার্টুন, ভিডিও গেমস্, যান্ত্রিক খেলনা ইত্যাদিতেই শিশুদের বেশীরভাগ সময় কাটে। মানবিক সংস্পর্শে মানবীয় গুণগুলো তাদের মধ্যে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেনা। টিভি কার্টুন ও ভিডিও গেমসের ফালতু বিষয়গুলো তাদের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে। ঘরে বন্দী শিশুরা নির্মল আনন্দ ও খেলাধূলার সুযোগ কম পাচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও বিষাদগ্রস্ততা জন্ম নিচ্ছে, তাদের মধ্যে ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ় মনোবল গড়ে ওঠছে না। সমাজ-সংসারের সাথে তারা একাত্ম হতে পারছে না। শিশুদের সামাজিকরণ প্রক্রিয়ায় এটি একটি বড় সমস্যা। বড় হয়ে এ ধরনের শিশু দেশ ও সমাজের জন্য যথাযথ অবদান রাখতে পারে না, বরং নিজেরাই পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিক শিক্ষার অপূর্ণতা শিশুর সুন্দর সোনালী ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক নয়।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

This site is protected by wp-copyrightpro.com

Shares