মিল্কি ২৮ নম্বর ‘কিলিং মিশন’ : *ক্রস ফায়ার*-জীবনের কি নির্মম অপচয় !
|
ফোনের ওপারের সেই নির্দেশদাতা কে? ডেস্ক ২৪: গুলশানের শপার্স ওয়ার্ল্ডের ক্লোজ্ড সার্কিট ক্যামেরায় ধরা পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ঘাতক তারেক ডান হাতে মিল্কির মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছেন। একই সময়ে বাম হাতে মোবাইল ফোনে কারো সাথে কথা বলছেন। যেন, গুলি ও মৃত্যুগোঙানির শব্দটা তাকে শুনাচ্ছিলেন ঘাতক। এ দৃশ্য খোদ মারদাঙ্গা চলচ্চিত্রকেও হার মানিয়েছে। ঘাতক এতোটাই সুনিপুনভাবে তার কাজ সম্পাদন করেছে যে, শিকার এক মূহুর্তের জন্যও প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ পায়নি। ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে সবার মনেই এখন প্রশ্ন উঠেছে, অলক্ষ্যের ইশারাকারী কে বা কারা ছিল? যার সাখে তারেক কথা বলছিলেন আর গুলি ছুড়ছিলেন? র্যাবেরও ধারণা, কথা বলা ছাড়াও তারেক বাম হাতের খোলা মোবাইলে কাউকে গুলির শব্দ বা মিল্কির আর্ত চিৎকার শোনাচ্ছিলেন। বিষটি নিয়ে তদন্ত করছেন তারা। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এ টি এম হাবিবুর রহমান বলেন, “তারেক অসুস্থ থাকার কারণে এখনও এ বিষয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হয়নি। সে সুস্থ হলে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।” তখন বেরিয়ে আসবে ফোনের ও প্রান্তে কে বা কারা ছিলেন। তবে র্যাবের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের সময় দুটি কারণে তারেক পাজামা, পাঞ্জাবি ও সাদা টুপি পরে ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন। প্রথমত, নিহত মিল্কি ও তারেক পূর্ব থেকেই পরস্পরের পরিচিত। তারা মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে একসাথে বড়ো হয়েছেন। সুতরাং, টার্গেটকে খুব কাছ থেকে গুলি করতে তারেকের প্রয়োজন ছিল মিল্কির অপরিচিত ছদ্মবেশ। পাঞ্জাবি, পাজামা ও টুপি পরার কারণ হিসেবে এটাকে প্রাথমিক সম্ভাবণা হিসেবে দেখছে র্যাব। এ বিষয়ে র্যাবের পক্ষ থেকে হাবিবুর রহমান বলেন, “হত্যাকাণ্ডের ভিডিওতে তারেকের দ্রুত হাঁটার দৃশ্য দেখে প্রাথমিকভাবে যে কারো মনে হবে, খুব ব্যস্ত একজন পথচারী কোনো প্রয়োজনে দ্রুত হাঁটছেন। মূলত সদ্য গাড়ি থেকে নেমে আসা মিল্কিকে বুঝতে না দেয়ার জন্য তারেক এ কৌশল অবলম্বন করেন।” দ্বিতীয়ত, প্রথম গুলি লক্ষ্যভেদ না করতে পারলে পরবর্তীতে একাধিক রাউণ্ড গুলি ব্যবহারের সুবিধা আদায় করতে চেয়েছিলেন তারেক। এজন্য তার প্রয়োজন ছিলো প্রথম গুলিটি ছোঁড়ার পর তা লক্ষ্যভ্রষ্ঠ হলে পথচারীদের ভীড়ে মিশে দ্বিতীয় গুলি করার মতো সময়টুকু। এমন ছদ্মবেশ নেওয়ার দ্বিতীয় কারণ, বিপনী বিতানের সামনে সদ্য তারাবির নামাজ থেকে দ্রুত বাড়ি ফিরছেন তারেক। হাবিবুর রহমান বলেন, “এমন অনেক ঘটনা আছে যে, প্রথম গুলি মিস হলে সন্ত্রাসীরা টার্গেটকে আর হত্যা করতে পারে না। এ ধরণের ধারণা থেকেই হয়তো তারেক ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন।” সোমবার গভীর রাতে গুলশানে শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন খান মিল্কি। এর কয়েক ঘণ্টা পর সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক এইচ এম জাহিদ সিদ্দিক তারেককে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে র্যাব। শপার্স ওয়ার্ল্ডের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় ধরা পড়ে ওই হত্যাকাণ্ডের চিত্র। ওই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি জানিয়ে র্যাবের পরিচালক বলেন, “এ ঘটনায় আটক সবাইকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।” গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মিল্কির ছোট ভাই মেজর রাশিদুল হক খান বাদি হয়ে মঙ্গলবার রাতে একটি মামলা করেছেন। এজাহারে জাহিদ সিদ্দিকী তারেককে প্রধান আসামি করে মোট ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরো কয়েকজনকে আসামি করেছেন বাদি। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত সাত জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারেক ছাড়া বাকি ছয় জনকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডেও নিয়েছে পুলিশ। যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক মিল্কি হত্যাকাণ্ডের মূল ‘আসামি’ যুবলীগের আরেক নেতা এইচ এম জাহিদ সিদ্দিক তারেক তার সহযোগী শাহ আলমসহ ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছেন।বুধবার রাতে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক জিয়াউল আহসান এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে নিহত অবস্থায় এক সন্ত্রাসীকে পাওয়া যায়। তার হাতে একটি অস্ত্র ছিল। এছাড়া কিছু দূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় আরো একটি অস্ত্র ও একটি মটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। র্যাব কিসমত হায়াত জানান, সন্ত্রাসীদেরগুলোতে দুজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। তাদের গায়ে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট না থাকলে তারাও প্রাণ হারাতেন। মূলত তারেককে র্যাবের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্যই ওই সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে ২৭টি ‘কিলিং মিশনে’ অংশ নেয় তারেক পেশাদার কিলার তারেক। এর আগেও ২৭টি ‘কিলিং মিশনে’ অংশ নিয়েছেন তিনি। যুবলীগ নেতা মিল্কি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তারেকের ২৮ নম্বর ‘কিলিং মিশন’। টেন্ডার ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে খুন হন যুবলীগ নেতা মিল্কি রাজনৈতিক ও টেন্ডার নিয়ে বিরোধের জের ধরেই যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন খান ওরফে মিল্কিকে খুন করা হয়েছে। অনেক দিন ধরে যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক এইচএম জাহিদ সিদ্দিকী তারেকের (৩৫) সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব চলতে ছিল। তবে বেশ কিছু দিন ধরে স্থানীয় কিছু কাজের টেন্ডার ও রাজনৈতিক পদ নিয়ে তার সঙ্গে বিরোধ আরো জোরালো হয়। এই কারণেই তারেক এবং তার সহযোগিরা মিল্কিকে খুন করে। পুলিশ ও নিহতের স্বজনদের সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ সর্ম্পকে র্যাবের আইন গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবীবুর রহমান জানান, তারেক ও তার গ্রুপের সাথে মিল্কি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বেও জড়িয়ে পড়েন। এই রেষারেষির জের ধরে মিল্কিকে খুন করা হয় বলে আমরা ধারণা করছি। তবে তার নিহতের ঘটনায় কয়েকটি দিক নিয়ে তদন্ত করছি। খুব দ্রুত আমরা নিহতের কারণ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করতে পারবো। নিহতের পারিবারিক সূত্র জানায়, মিল্কির হাত ধরেই তারেক রাজনীতিতে আসে। নিহত মিল্কির সাথে তারেকের প্রায় দেড় যুগের সম্পর্ক। তারা সব সময় এক সাথেই থাকতেন। এক প্লেটে ভাত খেতেন। প্রায় সাড়ে ৩ বছর আগে একটি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে দু’জনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব পরে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ায়। এরপর থেকে তাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। সম্প্রতি মিল্কির সাথে টেন্ডার নিয়ে তারেকের ঝামেলা হয়। পূর্বশত্রুতা আর টেন্ডার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে মিল্কিকে খুন করা হয় বলে তাদের ধারণা। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মিল্কিকে রাত দেড়টার দিকে সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত্যু ঘোষণা করেন। পরে রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলাবার সকালে মিল্কির মৃতদেহ মোহাম্মদপুরের ৬/৬ সৈয়দ রোডের নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোন মামলা হয়নি। গ্রেফতারকৃতদের র্যাব জিজ্ঞাসাবাদ করছে। আসামিদের তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তবে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে ১৫টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক একেএম রাশেদুল হক বলেন, মিল্কির মাথা ও পেটসহ ৯টি গুলির চিহ্ন দেখা গেছে। এর মধ্যে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে ৪টি গুলি বের করা হয়েছে। বাকি গুলিগুলো ভেদ হয়ে বেরিয়ে গেছে। এদিকে নিহতের খবর শুনে আত্মীয়-স্বজনদের পাশাপাশি দলীয় নেতারা মিল্কির মোহাম্মদপুরের বাসায় ছুটে আসেন। তারা নিহতের মা ও স্ত্রীকে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করেন। দুপুরের দিকে দেখা যায়, নিহতের স্ত্রী ফারজানা কানন শিপু বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। ৫ বছরের ছেলে রাশেদুল মায়ের কান্না দেখে এক আত্মীয়ের কোলে বসে কাঁদছে। মিল্কির ২ বছর বয়সী অবুঝ শিশুটি মায়ের পাশেই শুয়ে শুয়ে খেলছে। এদিকে মিল্কির লাশ গোসল দিয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়েছে। আজ সকালে জানাযা শেষে তাকে দাফন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। |




















