Main Menu

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেসরকারি ক্লিনিক, ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যু বাড়ছে

+100%-


শাহাদৎ হোসেন, : ‘তাড়াতাড়ি আপদ (রোগী) বিদায় করো। অন্য কোনো হাসপাতালে রেফার করে দায়িত্ব শেষ করো।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালের নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মনির হোসেনের তত্ত্বাবধানে শহরের দ্য ল্যাব এইড শিশু ও জেনারেল হাসপাতালে লুৎফুল কবির মিয়া (১০) নামের এক শিশু ভর্তির পর তার অবস্থার অবনতি হলে তিনি এসব কথা বলেন। পরে ওই শিশু মারা যায়।

শহরের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের অবহেলায় গত এক বছরে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া, এসব ক্লিনিকের বিরুদ্ধে সেবার নামে রোগীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।

এলাকার অনেকে জানান, ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল হাঁটুর ব্যথা ও জ্বর নিয়ে লুৎফুল কবির ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরে চিকিৎসক মনিরের অবহেলায় ৩০ এপ্রিল সে মারা যায়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা হুমায়ুন কবির ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ ঘটনার পর ওই চিকিৎসকের বিচারের দাবিতে শহরে সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়। কিন্তু আজও এ ঘটনার কোনো বিচার হয়নি।

সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, শহরের ৫৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ১৬টি ক্লিনিক ও আটটি ডেন্টাল ক্লিনিক রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৫০টির কোনো লাইসেন্স নেই। ১৬টির লাইসেন্স নবায়নের আবেদন তারা (সিভিল সার্জন কার্যালয়) স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। ১২টির লাইসেন্স নবায়নের আবেদন তাদের কাছে জমা আছে। এরই মধ্যে তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও দুটি ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২ আগস্ট শহরের পশ্চিম পাইকপাড়ায় অবস্থিত সেবা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের পর শরিফা বেগম (৩৬) নামের এক গৃহবধূ মারা যান। শরিফার বাড়ি কসবার ডাবিরঘর গ্রামে। তাঁর স্বজনেরা জানান, টনসিলের অস্ত্রোপচার করাতে চিকিৎসক আশিকুর রহমানের পরামর্শে ১ আগস্ট তাঁকে সেবা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। পরদিন রাতে ওই ক্লিনিকের মালিক চিকিৎসক বজলুর রহমানের উপস্থিতিতে আশিকুর ও অবেদনবিদ (অ্যানেসথেটিস্ট) আবদুল মান্নান তাঁর অস্ত্রোপচার করেন। এতে সঙ্গে সঙ্গেই শরিফার মৃত্যু হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার আমিনপুরের বাবুল মিয়ার স্ত্রী হেলেনা বেগম প্রসব ব্যথা নিয়ে ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট শহরের মৌলভীপাড়া শিশু ও জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। ২৮ আগস্ট হেলেনার অস্ত্রোপচার করেন ওই ক্লিনিকের চিকিৎসক জাকিয়া সুলতানা। হেলেনা একটি ছেলেসন্তান প্রসব করেন। নবজাতকটি অপরিণত হওয়ায় চিকিৎসক তাকে ইনকিউবেটরে রাখার পরামর্শ দেন। ইনকিউবেটরে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই দিন রাতেই শিশুটি মারা যায়। সে সময় এ ঘটনা তদন্ত করতে সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও ওই কমিটি এখনো কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। ওই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর শহরের মুন্সেফপাড়ার হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল ও সেখানকার এক চিকিৎসকের অবহেলার কারণে তাছলিমা আক্তার (২৫) নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। তাছলিমা কসবার গোপীনাথপুর গ্রামের আলম মিয়ার স্ত্রী। এ বছরের ১৬ জুলাই দ্য ল্যাব এইড শিশু ও জেনারেল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় সদর উপজেলার বেহাইর গ্রামের রুহুল আমিনের স্ত্রী শারমিন আক্তার নামের এক প্রসূতি মারা যান। জেলা সদর হাসপাতালের গাইনী, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন শরীফ মাসুমা ইসমতের ভুল চিকিৎসায় ওই প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন ও রোগীর স্বজনেরা হাসপাতালের নিচতলার অভ্যর্থনাকক্ষ, সেবিকা, অস্ত্রোপচার ও অফিসকক্ষের জানালা ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।

গত ১৯ জুলাই শহরের দ্য ল্যাব এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও স্পেশালাইজড হাসপাতালের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে নবীনগরের বিদ্যাকূট গ্রামের কৃষক হান্নান মিয়ার স্ত্রী হাজেরা বেগমের (৩০) কিডনি কেটে ফেলার অভিযোগ পাওয়া যায়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কিডনি থেকে পাথর অপসারণের সময় রোগীর অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসক তা কেটে ফেলেন। ওই হাসপাতালে কর্মরত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ফোরকান আহমদের তত্ত্বাবধানে ওই অস্ত্রোপচার হয়। এ ঘটনায় জেলা সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ আমানউল্লাহ আমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। অনেকে অভিযোগ করেন, ক্লিনিকগুলোতে ভুল চিকিৎসায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সিভিল সার্জন কার্যালয় ও স্বাস্থ্য বিভাগ লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করা ছাড়া কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, ‘কেউ যদি আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসত, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিতাম।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন আবু সাঈদ বলেন, ‘লাইসেন্সবিহীন ও লাইসেন্সের মেয়াদোত্তীর্ণ ক্লিনিকগুলোকে আমরা ইতিমধ্যে লিখিতভাবে চিঠি দিয়েছি।’






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Shares