ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও হত্যা মামলার আসামিকে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত নতুন সার ডিলারদের তালিকায় সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স বিলাল এন্টারপ্রাইজের মালিক বিল্লাল মিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিল্লাল মিয়া যুবলীগের কর্মী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলার আসামি। মামলার পর আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তিনি ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেন বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় উপজেলা কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তিনজনের নাম জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে সুপারিশ করা হয়। পরে সেই তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হলে সরাইলে কয়েকটি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, বিল্লাল মিয়া ২০২৫ সালের ৬ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলার ১৩৬ নম্বর আসামি। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
তাঁদের অভিযোগ, শাহজাদাপুর ইউনিয়নে উপজেলা প্রশাসনের তালিকায় প্রথমে ছাত্রদল নেতা দুলাল আহমেদের নাম সুপারিশ করা হলেও চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর পরিবর্তে ফয়সাল রাজা খালিদকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সরাইল উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক রিফাত বিন জিয়া বলেন, জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামিকে কীভাবে ডিলার নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলো, তা তদন্ত করা উচিত। কী মানদণ্ডে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দলের জন্য নিবেদিত এবং গত ১৭ বছর জেল-জুলুমের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। শুধু একটি ইউনিয়নে নয়, অধিকাংশ ইউনিয়নেই অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নতুন করে কাগজপত্র তৈরি করে জমা দেওয়া ব্যক্তিদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁর।
সরাইল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লস্কর তপু বলেন, জুলাই আন্দোলনের মামলার আসামিকে কীভাবে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর কামরুজ্জামান কবির বলেন, উপজেলা কমিটির মাধ্যমে জেলায় তালিকা পাঠানো হয়। সেখান থেকে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করার পর ডিলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তাঁরা শুনেছেন এবং এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, বিতর্কিত নামটি উপজেলা প্রশাসন থেকে সুপারিশ করা হয়নি; উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তালিকা পাঠানো হয়েছে।
সরাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. একরাম হোসেন বলেন, সার ডিলারের তালিকা তৈরির সময় তিনি সরাইলে কর্মরত ছিলেন। তখন ইউএনও ও তাঁর কাছে রাজনৈতিক সুপারিশে কয়েকজনের নাম এসেছিল। তবে নোয়াগাঁও ইউনিয়নের ওই ডিলারের জন্য তিনি সুপারিশ করেননি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, বিতর্কিত তালিকাটি ইউএনওর পাঠানো তালিকায় ছিল না। আইনবহির্ভূত কিছু হয়ে থাকলে তা বাদ দেওয়া হবে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, বিল্লাল মিয়ার বিরুদ্ধে সরাইল থানায় কোনো মামলা নেই। যাত্রাবাড়ী থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে তিনি জানতে
পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে তাঁদের অবহিত করা হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিল্লাল মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে, সার ডিলার নিয়োগের তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।
