ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে সড়ক দুর্ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, পর্যাপ্ত রোড সাইন না থাকা, যত্রতত্র ওভারটেকিং এবং অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন চলাচলের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা। গত ৯ মাসে মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৩৪ কিলোমিটার অংশে ৭০টি দুর্ঘটনায় ৭৬ জন নিহত ও ৫৫ জন আহত হয়েছেন। অথচ মহাসড়কের এ অংশে যানবাহনের অতিরিক্ত ওজন পরিমাপের জন্য কোনো সচল ওয়েট স্কেল নেই।
সরেজমিনে মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কটিতে প্রতিনিয়ত ভারী যানবাহন চলাচল করছে। অনেক চালক নিয়ম না মেনে যত্রতত্র ওভারটেক করছেন। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনীয় রোড সাইন না থাকায় চালকেরা সামনে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ওভারটেকিং নিষিদ্ধ এলাকা সম্পর্কে আগাম সতর্কতা পাচ্ছেন না।
মহাসড়কে চলাচলকারী বাসচালক রমজান মিয়া ও কুতুব উদ্দিন জানান, অনেক স্থানে রোড সাইন নেই। ফলে সামনে বাজার, স্কুল-কলেজ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে কি না, তা আগে থেকে বোঝা যায় না। ওভারটেকিং নিষিদ্ধ এলাকা ও জেব্রা ক্রসিং সম্পর্কেও পর্যাপ্ত সংকেত নেই। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। দুর্ঘটনা কমাতে দ্রুত মহাসড়কের পাশে প্রয়োজনীয় রোড সাইন স্থাপনের দাবি জানান তাঁরা।
খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধ ও যানজট নিরসন পুলিশের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন স্থানে সাইনবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজার ও বিশ্বরোড মোড়সহ জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় সভা-সমাবেশ ও সেমিনারের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলে পুলিশের কোনো সচল ওয়েট স্কেল নেই। তবে যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। অতিরিক্ত পণ্যবোঝাইয়ের বিষয়টি ধরা পড়লে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সহকারী পরিচালক ফারুক আলম বলেন, সড়কে রোড সাইন স্থাপনের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ বিভাগের। অন্যদিকে, জনগণকে সচেতন করতে বিআরটিএ বিভিন্ন স্কুল-
কলেজের শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করা যায় না, নাগরিকদের অসচেতনতাও এর অন্যতম কারণ।
তিনি জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক। ডোপ টেস্ট ছাড়া কারও ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউনুস আলী রোড সাইন না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, মহাসড়কের উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় কিছু অংশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তুলে ধরা হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সংস্কার ও রোড সাইন স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ওয়েট স্কেল স্থাপনের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। যেসব স্থানে ওয়েট স্কেল স্থাপনের কথা রয়েছে, সেসব স্থানের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। একই কারণে সব স্থানে মাইলফলক ও রোড সাইন স্থাপন করা যায়নি। দ্রুত এসব কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সড়ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের ২০টি জেলার অন্তত ২৫ হাজার দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করে। গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো দ্রুত সংস্কার, রোড সাইন স্থাপন ও প্রয়োজনীয় নজরদারি জোরদারের দাবি উঠেছে।
