
ছায়েদুল হক আমার পাশের উপজেলার বাসিন্দা এবং আমি স্কুল জীবন থেকেইে ছাত্রলীগের একজন কর্মী ছিলাম বিধায় ছায়েদ ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ২৫/৩০ বছরের। তবে ঘনিষ্টতা হয় ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ৯৬ এর নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৬টি নির্বাচনী এলাকায় একটি জরিপ করার জন্য আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমার রিপোর্টে আমি উল্লেখ্য করেছিলাম, নাসির নগর থেকে ছায়েদুল হককে মনোনয়ন দেওয়া হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৬টি আসনের মধ্যে একমাত্র এই আসনটিতেই আওয়ামী লীগের নিশ্চিত বিজয় হবে। আমি যখন রিপোর্ট নেত্রীর হাতে দিলাম তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম জিল্লুর রহমান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নেত্রী সেদিন আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পরদিন সকালেই ছায়েদ ভাইকে নিয়ে জিল্লু ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার জন্য। ছায়েদ ভাই তখন পুরনো ঢাকায় আগামাসি লেনে একটি পুরনো জীর্ণ শীর্ণ বাসায় থাকতেন। বাসায় অনেক পুরনো ভাঙ্গাচোরা সোফায় বসা থেকে উঠতে গিয়ে সোফার ভাঙ্গা স্পিংয়ে আমার প্যান্ট আটকে নতুন প্যান্টটি ছিড়ে গিয়েছিল। আমি তখন ছায়েদ ভাইকে বলেছিলাম আপনার সোফার এ অবস্থা কেন ? তিনি বলেছিলেন, বাঁচবোই কয়দিন কী হবে এত আরাম দিয়ে।
১/১১ দুঃসময়ে ছায়েদ ভাই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঐ সময় গুলশানে জিল্লুর রহমানের বাসায় একদিন ছায়েদ ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হলে তিনি আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে যান। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি জানান বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১) ভিজিএফ কার্ড সম্পর্কে তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় পদক্ষেপের কথা বলতে যেয়ে এক পর্যায়ে ছায়েদ ভাই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি সেদিন স্মৃতিচারন করতে গিয়ে বলেছিলেন ভিজিএফ কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর তিনি আরো ছয় মাস তা অব্যাহত রাখার জন্য সভায় প্রস্তাব করেন। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আপত্তির অজুহাত দেখিয়ে আমলারা কোনভাবেই কার্ডের সুবিধার মেয়াদ বাড়াতে রাজী হননি। এক পর্যায়ে ছায়েদ ভাই (তিনি তখন খাদ্য মন্ত্রণালয় সংসদীয় বিষয়ক কমিটির সভাপতি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে ভিজিএফ কার্ডের সুবিধা আরো ছয়মাস বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। দেশের অসহায় মানুষের কথা চিন্তা করে, প্রধানমন্ত্রী তাতে একমত পোষন করেন আরো ছয়মাসের জন্য এই সুবিধা বৃদ্ধির নির্দেশ দেন।
দেশের গরীব দুঃখী মানুষের নেত্রী শেখ হাসিনাকে অন্যায় ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেফতারের কথা বলতে গিয়ে ছায়েদ ভাই সেদিন চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ছায়েদ ভাই কে আমরা একজন কঠিন মনের মানুষ বলেই মনে করতাম, তাকে আমি সেদিনই প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম। এ বিষয়ে আমার লেখা ‘শেখ হাসিনা যখন কারাগারে’ গ্রন্থে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
ছায়েদুল হকের সাথে আমার সম্পর্ক বরাবরই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। গত কয়েক মাস আগে আশুগঞ্জে হাজী আঃ কুদ্দুস উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ভবন উদ্বোধনের জন্য ছায়েদ ভাইকে আমন্ত্রন জানাতে গেলে সেদিন তিনি আমার সাথে প্রায় একঘন্টা গল্প করেন। দেশের মৎস সম্পদের বিপুল সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে তার বিশাল কর্মযজ্ঞের বর্ণনা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। সমুদ্র জয়ের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি যেভাবে পরিকল্পনা করে মৎস্য খাতকে আরো সম্প্রসারনের উদ্যোগ গ্রহন করেছিলেন তা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আপনি এত কাজ করেছেন অথচ মিডিয়ায় আপনাকে কম দেখা যায় কেন ? জবাবে ছায়েদ ভাই বলেছিলেন টেলিভিশনে চেহারা দেখিয়ে কী হবে। কাজ করাটাই বড় কথা । প্রধানমন্ত্রী আমাকে যে কাজ দিয়েছেন আমি সেটাই করার চেষ্টা করছি।
ছায়েদুল হকের একমাত্র সন্তান রায়হান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ শাখার সভাপতি ছিলেন। তিনি ডাক্তারী পাশ করার পর তাকে এবং তার স্ত্রী (তিনিও ডাক্তার) ছায়েদ ভাই তার নিজ উপজেলা প্রত্যন্ত অঞ্চল নাসিরনগরে পোষ্টিং দেন মানুষের সেবা করার জন্য। একজন কেবিনেট মিনিষ্টারের সন্তানকে দেশের প্রত্যন্ত নিভৃত গ্রামে নিজ এলাকার মানুষের সেবা করার জন্য নিয়োজিত করার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি আছে কিনা আমার জানা নেই।
আমি ছায়েদ ভাইয়ের কাছে থেকে যতটুকু দেখেছি তাঁর কোন বৈষয়িক চাহিদা ছিল না। রাজনীতিতে তিনি নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করেননি। তিনি আপুদমস্তক একজন নির্মোহ রাজনীতিবিদ ছিলেন। দেশ এবং জনগণের জন্য ভাল কিছু করাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এক সময় দূর্গম ও প্রত্যন্ত উপজেলাটি আজ আধুনিকায়নের ছোয়া লেগেছে। গ্রামে গ্রামে পাকা রাস্তা, বেশ কয়েকটি সরকারী বড় বড় স্থাপনা আজ মাথা উচু করে নাসিরনগরের উন্নয়নের জানান দিচ্ছে। নাসিরনগরের শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয় পাশ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের সাথে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ছায়েদ ভাইয়ের জানাজা লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি, বুকফাঁটা আর্তনাদ এবং চোখের জলে তাকে বিদায় জানানো তো ছাইয়েদ ভাইয়ের এই কর্মেরই ফসল।
বিত্ত বৈভব ভোগ বিলাসের জীবন তাঁকে টানেনি। টেনেছিল মানুষের ভালোবাসা। আদর্শচ্যুত হননি বলে মৃত্যুতে সব মত পথের মানুষ তাদের কফিনের পাশে এক হয়ে মিলিত হয়েছিল। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে কেউ কার্পণ্য করেনি। আদর্শচ্যুত মানেই দলবদল নয়, আদর্শচ্যুত না হওয়া মানে মানবকল্যাণের ইবাদতমুখী আদর্শিক রাজনীতি থেকে সরে না যাওয়া। ক্ষমতার দম্ভ ও বিত্ত বৈভবের লোভ মোহে নিজেকে না ভাসিয়ে জীবনের পরতে পরতে অর্থনৈতিক কষ্টকে সয়ে যাওয়া। তবু মানুষের সেবা থেকে বিরত থাকা নয়। মানুষের জন্য আদর্শিক পথে ত্যাগের মহিমায় যে রাজনীতিবিদ জীবন উৎসর্গ করেন ইতিহাস তাকেই অমরত্ব দেয়।
আজীবণ প্রচারবিমুখ এই মানুষটি মৃত্যুর বছর খানেক আগে হঠাৎ করে মিডিয়ার খোরাক হন। তাঁর নিজ উপজেলা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে জেলা আওয়ামী লীগের সাথে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে জেলা আওয়ামী লীগ তাকে জেলা উপদেষ্টার পদ থেকে বহিষ্কার করে। যদিও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতান্ত্রিক বিধান অনুযায়ী কেন্দ্রিয় কমিটির অনুমোদন ছাড়া একজন প্রাথমিক সদস্যকেও বহিষ্কার করার এখতিয়ার কারো নেই। যে ছায়েদুল হক সারাটি জীবন দলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন সেই ছায়েদুল হক নিজ জেলা থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। সেই কষ্ট নিয়েই হয়ত তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে । ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন সন্তান হিসেবে ছায়েদ ভাইয়ের কাছে কড়জোড়ে ক্ষমা চেয়ে বলছি আপনি নিজগুনে আমাদের ক্ষমা করে দিন। আপনি শান্তিতে খাকুন আপনার জন্মভূমি নাসিরনগরের পবিত্র মাটিতে।