
মিঠু সূত্রধর পলাশ : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বিটঘর ইউনিয়ন অফিস ভাঙচুর ও দোকানপাটে লুটতরাজের অভিযোগ এনে দীর্ঘদিন এলাকার লোকজনকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। মামলার বাদী ওই ইউনিয়নের সদস্য না হয়েও নবীনগর থানায় মনগড়া অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি।
গত সোমবার সরেজমিনে বিটঘর ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে দেখা যায়, এলাকাবাসী নিয়মিত যাতায়াত করছেন, তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মও রীতিমতো তারা সারছেন। সেবাপ্রার্থীদের কাছে ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, এধরনের কোনো ঘটনা গত কয়েক বছরে এলাকায় ঘটেনি।
গত ২ ডিসেম্বর ওয়ারিশান জমি নাম জারির জন্য ইউনিয়ন অফিসে যান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক। হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, হামলা-ভাঙচুরের কোনো চিহ্ন বা লক্ষণ আমার চোখে পড়েনি।
জানা যায়, ঘটনার চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে মামলার বাদীর পরিচয়। যিনি নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে মামলা করেছেন, তিনি নাটঘর ইউনিয়ন ৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ১নং সহ-সভাপতি হুমায়ুন কবির। একটি ইউনিয়ন অফিস ভাঙচুর মামলায় আওয়ামী লীগ নেতার বাদী হওয়া এই বাস্তবতা সামনে আসার পর পুরো মামলাটিই নতুন করে সন্দেহের মুখে পড়েছে।
এজাহারের গল্প বনাম মাঠের বাস্তবতা : মামলার এজাহারে, (৩০/১০/২৪) তারিখে (মামলা নং ১৯) নম্বর মামলায় বলা হয় ৫৪ জন এজহারনামা ও ৭০/৮০ জন অজ্ঞাত নামা আসামিগণ সংঘবদ্ধভাবে বিটঘর ইউনিয়ন অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনা ঘটে এবং বাজারের বিভিন্ন দোকানে লুটপাট করে ৯০ লক্ষ টাকা নিয়ে যায়। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, এজাহারের বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, অভিযোগে উল্লেখিত দিন ও সময়ে সেখানে কোনো বড় ধরনের ভাঙচুর বা সংঘর্ষের দৃশ্য তারা দেখেননি। অফিসে ভাঙচুর হলে যে ধরনের শব্দ, জনসমাগম বা উত্তেজনা তৈরি হওয়ার কথা সেদিন এলাকায় তেমন কোনো পরিস্থিতিই তৈরি হয়নি।
অভিযুক্তদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন : এদিকে, মামলায় যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে ঘটনার সময় তারা এলাকায়ই ছিলেন না। কেউ ছিলেন কর্মস্থলে, কেউ আবার জেলার বাইরে। এজাহারে সময়, স্থান ও অভিযুক্তদের উপস্থিতি নিয়ে যে অসঙ্গতি ধরা পড়ছে, তা মামলার বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে জানান তারা।
আইনজ্ঞদের মতে, “এ ধরনের অসঙ্গতি সাধারণত সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় দেখা যায়।”
বাদীর ভূমিকা ও রাজনৈতিক সুবিধা
মামলার বাদী হুমায়ুন কবির দীর্ঘদিন ধরে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগাযোগও নতুন নয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক নেতা কীভাবে একটি ইউনিয়ন অফিস ভাঙচুর মামলায় নিজেকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ দাবি করেন? তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না, থাকলেও কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন সে বিষয়ে এজাহার ও বক্তব্যে স্পষ্টতা নেই।
এ বিষয়টি মামলাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির অন্যতম সদস্য হযরত আলী বলেন এটি একটি ‘ক্লাসিক মামলা বাণিজ্য’ এবং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক মামলা।
নবীনগর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনন্ত হীরা বলেন, মামলার বাদী নবীনগর উপজেলা বিএনপি’র ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রয়াসে অসদুদ্দেশ্যে এই মামলাটি দায়ের করেন।
এ বিষয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী শাহজাহান বলেন, আমি এই মামলার আসামি, আমার নাম কেটে দেওয়ার জন্য মামলার বাদী হুমায়ুন কবির আমার কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা গ্রহণ করে। কিন্তু আমার নাম আদৌ কাটা যায় নাই। মামলার পর থেকে অভিযুক্ত বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে। পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।
এবিষয়ে বিটঘর ইউপি চেয়ারম্যান মেহেদী জাফর দস্তগীর বলেন, ইউনিয়ন অফিস বা বিএনপি অফিস ভাংচুরের মত কোন ঘটনা হতে দেখিনি। এসব মামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার সংস্কৃতি সমাজে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। এতে সাধারণ মানুষও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, “মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নয়, পুরো বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী হুমায়ুন কবির বলেন, আমি বিটঘর গিয়েছিলাম আমার উপর হামলা হওয়ায় আমি মামলা করি। আপনি বিএনপি’র কোন পদে আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অনেক আগে কৃষক দলের কমিটিতে ছিলাম। আপনি আওয়ামী লীগের কমিটিতে কিভাবে এলেন জানতে চাইলে বলেন, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগে আমার নাম এসেছে এটা আমার জানা নেই।
নবীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, আদালতের আদেশে নবীনগর থানা মামলাটি রুজু করে। “মামলাটি তদন্তাধীন। আমরা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছি। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না।” অপর এক প্রশ্ন বলেন এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।