The voice of Brahmanbaria || Local news means the world is

খালের শহর থেকে কংক্রিটের নগরী: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হারিয়ে যাওয়া ৪৫ খালের গল্প

একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরকে চিনতে হলে তার খালগুলোর কথা বলতে হতো। শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সরু জলপথগুলো ছিল মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের প্রধান অবলম্বন। বর্ষার মৌসুমে খালগুলো ভরে উঠত পানিতে, আর শুষ্ক মৌসুমেও কোথাও না কোথাও দেখা মিলত নৌকার। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই খালগুলোর অধিকাংশই আজ হারিয়ে গেছে। কোথাও হয়েছে রাস্তা, কোথাও ভবন, কোথাও আবার ড্রেনে রূপান্তরিত হয়েছে এক সময়ের প্রবহমান জলধারা।
ভূমি রেকর্ড বলছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিভিন্ন মৌজায় ৪৫টি খালের অস্তিত্ব রয়েছে। অথচ বাস্তবে সেগুলোর অধিকাংশেরই কোনো চিহ্ন নেই। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না, তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে কিংবা যে সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করেন, সেখানেই একসময় ছিল একটি খাল।
স্মৃতিতে ভাসে নৌকার দিন
শহরের প্রবীণ বাসিন্দাদের কাছে খালের গল্প এখন নস্টালজিয়ার অংশ। তারা স্মরণ করেন, কালীবাড়ী মোড় থেকে শিমরাইলকান্দি রাজঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল একটি বড় খাল। তিতাস নদীর সঙ্গে সংযুক্ত সেই জলপথ দিয়ে নৌকায় মানুষ যাতায়াত করত, আনা-নেওয়া হতো পণ্য।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, আশির দশকের শেষভাগ পর্যন্ত এসব খালে নৌকা চলাচল ছিল নিয়মিত দৃশ্য। জেলা পরিষদের সামনে, স্টেশন রোডের পাশে কিংবা মেড্ডা এলাকায় ছিল পানিপূর্ণ খাল। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে খালের অস্তিত্ব কল্পনা করাও কঠিন।
টাউন খাল: পুনর্জাগরণের ব্যর্থ চেষ্টা
শহরের সবচেয়ে পরিচিত টাউন খাল এখনও টিকে আছে নামমাত্র। প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালের অধিকাংশ অংশ দখল ও ভরাটের কারণে কার্যত মৃতপ্রায়। গত মার্চে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খালের একটি অংশ পরিষ্কার করা হলে তিতাস নদী থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত কিছুটা পানি প্রবাহ ফিরে আসে। এতে আশার সঞ্চার হলেও পুরো খাল সচল করার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি।
খালটির পাড়ে দাঁড়ালে এখনও বোঝা যায়, একসময় এটি ছিল শহরের প্রাণরেখা। কিন্তু চারপাশের দখল, ময়লা-আবর্জনা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ তার অস্তিত্বকে সংকুচিত করে ফেলেছে।
খাল থেকে ড্রেন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকটি ঐতিহাসিক খাল এখন ড্রেনে পরিণত হয়েছে। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, একসময় নৌকা চলাচল করা তিনটি খালকে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ড্রেন হিসেবে রূপান্তর করা হয়।
মেড্ডা, বিরাশার, কাজীপাড়া কিংবা শিমরাইলকান্দির বাসিন্দারা এখনও মনে করতে পারেন, নব্বইয়ের দশকেও এসব খাল দিয়ে ইট-বালুবাহী নৌকা চলাচল করত। অথচ বর্তমানে সেগুলোর ওপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসিয়ে পথ কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবহার উপযোগী জায়গা বানানো হয়েছে।
এর ফলে শুধু খালের অস্তিত্বই বিলীন হয়নি, শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
জলাবদ্ধতার নতুন সংকট
খাল হারানোর মূল্য এখন দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। অল্প বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। মেড্ডা, বিরাশার, কাজীপাড়া, মোড়াইল, বণিকপাড়া ও ঈদগাহ মাঠ এলাকায় বর্ষা মৌসুমে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে।
পৌরসভার কর্মকর্তারা বলছেন, ড্রেনের ওপর স্থায়ী স্ল্যাব নির্মাণের কারণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
রেকর্ডে ৪৫, বাস্তবে কত?
বিএস খতিয়ান অনুযায়ী ভাদুঘর মৌজাতেই রয়েছে ২৪টি খাল। এছাড়া পৈরতলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পুনিয়াউট, পশ্চিম নয়নপুর ও পশ্চিম পাইকপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও বহু খালের উল্লেখ আছে।
কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলছেন—এসব খাল এখন কোথায়?
সাবেক জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেকর্ডে থাকা অনেক খাল হয় ভরাট হয়ে গেছে, নয়তো দখলের কারণে সম্পূর্ণ বিলীন হয়েছে। কিছু খালের ওপর নির্মিত হয়েছে রাস্তা, আবার কিছু জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি ও স্থাপনা।
এখনও বেঁচে আছে একটি খাল
শহরের দক্ষিণাংশের কুরুলিয়া খাল এখনও প্রবাহমান। এটিই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের হাতে গোনা কয়েকটি জীবিত খালের একটি। স্থানীয়রা মনে করেন, যথাযথ উদ্যোগ না নিলে এই খালও একদিন ইতিহাস হয়ে যেতে পারে।
ফিরে আসবে কি হারানো জলপথ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল শুধু পানি প্রবাহের মাধ্যম নয়; এটি একটি শহরের পরিবেশগত ভারসাম্যের অংশ। খাল ভরাট হলে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যায়, জলাবদ্ধতা বাড়ে এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হারিয়ে যাওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধার করা সহজ কাজ নয়। তবে রেকর্ডভুক্ত খাল চিহ্নিত করা, দখলমুক্ত করা এবং ধাপে ধাপে পুনঃখননের উদ্যোগ নিলে অন্তত কিছু খালকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনও ভাসে খালের বুকে চলা নৌকার দৃশ্য। নতুন প্রজন্মের কাছে সেটি যেন রূপকথার গল্প। প্রশ্ন একটাই—ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি আবার তার হারিয়ে যাওয়া জলপথের কিছুটা হলেও ফিরে পাবে, নাকি খালের শহর চিরতরে হারিয়ে যাবে কংক্রিটের নগরীর ভিড়ে?
Exit mobile version