The voice of Brahmanbaria || Local news means the world is

কিরগিজস্তানে ইটভাটায় দূর্ঘটনায় নিহত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবুল খায়ের, অকুল পাথারে পরিবার

গত ২০ মার্চ কিরগিজস্তানের সোকুলুক শহরে কর্মস্থলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আবুল খায়ের।
ছোট্ট আরহামের জন্মের আগেই কিরগিজস্তানে পাড়ি জমান বাবা আবুল খায়ের (৪২)। তাই বাবাকে কখনো ছুঁতে পারেনি সে। বাবা আবুল খায়েরেরও সন্তানকে দেখার তীব্র তৃষ্ণা। হাজার মাইল দূর থেকে সন্তানকে দেখার সেই তৃষ্ণা মেটে ভিডিও কলে।
আরহামের বয়স এখন ১৫ মাস। আধো আধো কণ্ঠে ‘বাবা, বাবা’ বলে ডাকে। বাবার সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠছে কেবল! এরই মধ্যে বাবা নামের বটবৃক্ষ হারিয়েছে সে।
গত ২০ মার্চ কিরগিজস্তানের সোকুলুক শহরে কর্মস্থলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আবুল খায়ের। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া গ্রামের আব্দুল জাব্বারের ছেলে।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অকূল পাথারে পড়েছেন আবুল খায়েরের স্ত্রী হামিদা আক্তার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট আবুল খায়ের। তার বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই। অভাব-অনটনের মধ্যেই বেড়ে উঠা খায়েরের। তাই অবভাব দূর করতে পরিবারের জন্য সুখের স্বপ্ন নিয়ে ২০২৪ সালের জুন মাসে বিয়ের মাত্র ৫ মাসের মাথায় পাড়ি জমান কিরগিজস্তানে।বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রায় ৪ লাখ টাকা যোগাড় করতে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া মাত্র দেড় শতাংশ জমিটুকুও বিক্রি করে দেন। কিছু টাকা ঋণও নেন। কিন্তু বিদেশে গিয়েও ভাগ্য ফেরেনি খায়েরের। নির্ধারিত কোনো কাজ না থাকায় যখন যা পেয়েছেন, সেই কাজই করেছেন। বেশিরভাগ সময়ই কর্মহীন থাকতে হতো তাকে। সর্বশেষ কিরগিজস্তানের সোকুলুক শহরের একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে এক মাসের মতো কাজ করেন।
স্ত্রী-সন্তান আর পরিবারের বাকি সদস্যদের ভালো রাখতে বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম আর কষ্টের জীবন মেনে নিয়েছিলেন খায়ের। অনেক স্বপ্ন ছিল তার। গত ২০ মার্চ দুপুরে ইটভাটায় কাজ করার সময় হঠাৎ করে মাটির স্তূপ ধ্বসে পড়ে খায়েরের ওপর। সহকর্মীরা তাকে উদ্ধারের আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। শেষ হয় তার জীবন-সংগ্রাম।
খায়েরের পরিবারের সদস্যরা জানান, কিরগিজস্তান যাওয়ার আগে কিছুদিন সৌদি আরবে ছিলেন খায়ের। কিন্তু সেখানে সুবিধা করতে না পেরে দেশে ফেরত চলে আসেন। এরপর বছর দেড়েক বাড়িতে থাকার পর ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে ঢাকার বনানী এলাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে কিরগিজস্তান যান খায়ের।
এজেন্সি থেকে বলা হয়েছিল সিরামিক কারখানায় কাজ দেওয়া হবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাক্সিখত কাজ পাননি। ফলে পরিবারের জন্য সুখের আশায় বাড়ি ছাড়লেও হতাশা ছিল তার মনে। বর্তমানে বড় ভাই রফিক মিয়ার জায়গায় ছোট্ট একটি ঘর তুলে বসবাস করছে খায়েরের স্ত্রী-সন্তান।
স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ আবুল খায়েরের স্ত্রী হামিদা আক্তার। একদিকে স্বামীর মৃত্যু, অন্যদিকে সন্তানের অনিশ্চত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।হামিদা আক্তার বলেন, ‘ঘটনার দিন (২০ মার্চ) সকালে ফোন করেছিল খায়ের। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কাজে যাবে কি না, বলেছিল যাবে না। এরপর ছেলেকে দেখেছে। পরে আবার একবার ফোন করে কথা বলেছে। এরপর সারাদিন আর কথা হয়নি। বিকেলে আমি ফোন করার পর তার সঙ্গে কাজ করা একজন ফোন রিসিভ করেছে। আমার সঙ্গে কথা না বলে আমার ভাসুরের সঙ্গে কথা বলেছে। একপর্যায়ে জানিয়েছে খায়ের কাজ করার সময় বুকে ব্যাথা পেয়ে মারা গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওনিই (খায়ের) পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার উপার্জনেই সংসার চলতো। তার মৃত্যুতে আমাদের পরিবারে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে কীভাবে কী করব- কিছ্ইু বুঝে উঠতে পারছি না।’
তিনি আরও জানান, ‘কখন আমার স্বামীর মরদেহ দেশে আসবে, সেটাও জানি না। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই দ্রুত যেন আমার স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনে।’
খায়েরের বড় ভাই রফিক মিয়া বলেন, ‘খায়েরের সহায়-সম্পদ বলতে কিচ্ছু নেই। বিদেশ যাওয়ার জন্য শেষ সম্বল বাড়ির জায়গাটুকুও বিক্রি করে দিয়ে গেছে। পরে তার স্ত্রী-সন্তানকে থাকার জন্য আমি আমার জায়গায় ঘর করতে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার পর ভালো কোনো কাজ পায়নি। যখন যা পেয়েছে, সেই কাজ করেছে। খায়েরের মরদেহ আনার জন্য কিরগিজস্তানে থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। সে বলছে যে ইটভাটায় কাজ করত, তারা নিজেরা খরচ দিয়ে মরদেহ দেশে পাঠাবে। কিন্তু কোনদিন মরদেহ পাঠাবে- সেটা এখনও ঠিক হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘খায়ের বৈধভাবেই কিরগিজস্তানে গিয়েছিল। এখনও তার ঋণ আছে। তার স্ত্রী-সন্তানের এখন কী অবস্থা হবে, তারা কীভাবে চলবে- কিছুই বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে দাবি জানাই অন্তত খায়েরের স্ত্রী-সন্তানের জন্য যেন কিছু একটা করে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া বলেন, ‘খায়েরের মৃত্যুর বিষয়ে তার পরিবারের কেউ আমাদের জানায়নি৷ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা অবশ্যই দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
Exit mobile version