Main Menu

মদন মিয়ার সমাজে উঠা (একটি সমসাময়িক ঘটনা বহুল ছোট গল্প)

+100%-

মদন মিয়াদের পারিবারিক পদবী দাই। অর্থাৎ তার পূর্ব পুরুষ গণ জমিদারের সন্তানদের লালন পালন করতেন। ছোট বেলা থেকেই মদন লেখা পড়াতে ভালো করাতে নিঃসন্তান জমিদার মশাই নিজের সর্বস্ব বিক্রয় করেই মদন কে পড়াশুনা করান। ক্লাস নাইনে রেজিস্ট্রেশনের সময় নিজের নাম মদন দাই থেকে মদন মিয়াতে উন্নীত করে নিল মদন। কারন দাই পদবী খানার চেয়ে মিয়া পদবীতে একটু ভারিক্কী ভাব আছে। পড়াশুনাimage_1294_322453.gif করে মদন এস এস সি এবং এইচ এস সি তে ভালই ফলাফল করল। পাশের বাড়ির আব্দুল ভাইয়ের কাছে শুনে সে এবার চলল কোচিং করতে উদ্দেশ্য খুব ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। নিঃসন্তান জমিদার মদন কেই নিজের সন্তানের মত স্নেহ করেন বলে তাকে নিজের বউয়ের গলার চেইন বিক্রয় করে শহরে পাঠালেন কোচিং করতে। মদন কোচিং করে এক নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল।

বিশ্ববিদ্যালয় হতেই মদন একজন সহধর্মিণী যোগাড় করে ফেলল। সহধর্মিণীর সাথে সংসার করে মদন বুঝল অনার্সের পরে তার আর পড়াশুনার দরকার নাই। কারন অনার্স করেই যেহেতু চাকুরী পাওয়া যায় সেহেতু মাস্টার্স করে কি লাভ। এই কথা শুনে জমিদার মশাই কষ্ট পেলেও কষ্ট চেপে রেখে এক প্রকার জোড় করেই মদন কে উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। এখানে এসে মদন মিয়া বুঝলেন জমিদার মশাই ভালো কাজই করেছেন। বাইরে এসে না পড়াশুনা করলে সমাজে উঠা যাবে না। এতো দিনে তার দাই থেকে মিয়া হওয়াটা হয়ত সার্থক হবে।

মদনের দিন আনন্দেই কাটতেছিল। এখানে এসে মদন অনেক সামাজিকতা শিখতে ছিল। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল- জন্মদিন পালন এবং যে ব্যক্তির জন্মদিন সে সারাদিন অপেক্ষাতে থাকবে অতঃপর রাতে সবাই কেক নিয়ে হাজির হলে অভিনয় করে বলবে “কি করলে এসব, আমি সারপ্রাইজড, অতঃপর পরের দিন ফেসবুকে সেই ছবি দিয়ে বলবে “সারপ্রাইজ কেক এবং গিফট, জিবন অনেক উপভোগের!”; সামান্য ব্যপার কে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে অসামান্য করে তোলা; জন্ম দিনের কেকের চকলেটের রঙ কি হবে এটা নিয়ে বাকযুদ্ধ করা; কে কাকে বিপদে ফেলে তার উপকারের নামে ক্রেডিট নিতে পারে সেই চেষ্টা করা; যাদের গাড়ি আছে তারা যা বলে তাতেই চমৎকার সেতো চমৎকার বলে ঘি মর্দন করা ইত্যাদি। মদন এখানে নিজেকে জমিদারের পুত্র বলেই পরিচয় দেয়। মদনের এখন একটাই স্বপ্ন সে এক খানা গাড়ি ক্রয় করবে। তা না হলে কেউ তাকে মূল্য দিবে না। গাড়ি ক্রয়ের জন্য মদন টাকা জমা করতেছিল।

এমন এক সময় খবর এলো জমিদার মশাই এর অসুখ বেড়েছে। হাতে টাকাও বাড়ন্ত যদি মদন কিছু টাকা ধার দিত পরে জমিদার মদনের নামে জমি লিখে দিতেন। মদন এতে যারপর নাই বিরক্ত হল। কি সব ফালতু অশিক্ষিত লোকজন এরা জানে না এখানে স্ট্যাটাস নিয়ে চলতে গাড়ি কত জরুরী। আর জমিদার মশাই তার কে যে এতো শখের জমানো টাকা হতে টাকা দিতে হবে? মদনের বউ বলে দেও না কিছু টাকা আমরা না হয় এক মাস পরে গাড়ি কিনব। কিন্তু মদন রাজী না। সে মুকুন্দ দাদা কে দেখিয়েই ছাড়বে যে তারও গাড়ি ক্রয়ের মুরোদ আছে। টাকার অভাবে জমিদার মশাই বিনা চিকিৎসাতে মারা গেলেন। যেদিন জমিদার মশাই বিনা চিকিৎসাতে মারা গেলেন সেদিন মদন তার সার্টিফিকেট এর জন্ম দিন পালনে ব্যস্ত থাকার কারনে বাড়িতে একটা কল ও করতে পারে নি।

যাই হোক জমিদার মশাই মারা যাবার পরের মাসেই মদন একটি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি ক্রয় করল। গাড়ীর সীটে বসে প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে সেদিনই একটি সেলফি দিল ফেসবুকে। ছবির ক্যাপশন দিল- ফিলিং স্যাড ফর জমিদার বাবা, তুমি আমার সুখের দিন দেখে যেতে পারলে না :( । মুহূর্তেই সেখানে লাইক কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল। অভিনন্দনের এবং শোক বার্তার মাধ্যমে নতুন গাড়ীর মালিক দের সমবেদনা জানানোর লোকের অভাব হল না। সেই কমেন্টের মাঝে মদনের এক বাল্য বন্ধু মন্তব্য করে বসল “ওরে মদন, তুই গাড়ি ক্রয়ের টাকা পেলি কিন্তু জমিদার চাচা বিনা চিকিৎসাতে মারা গেল! তোর তো খুশীর দিন এখন, জমিদার মশাই তোর নামে তার স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি লিখে দিয়ে গেছেন”। মদন অন্যদের কমেন্ট পড়ে পুলকিত হলেও এই কমেন্ট দেখেই তার মেজাজ বিগড়ে গেল। সাথে সাথে সে কমেন্ট ডিলিট করে ঐ বন্ধু কে ফ্রেন্ড লিস্ট থেকে বিতাড়িত করল। মদনের বউ বলল ও না একবার তোমার জিবন বাঁচিয়েছিল? মদন বলল তাই বলে এ ধরণের মন্তব্য করবে। আমার একটা প্রেস্টিজ আছে না! মদনের বউ বলল যা বলেছে সত্যি বলেছে এতে তোমার প্রেস্টিজ যাওয়ার চিন্তা থাকলে কাজ করার আগেই চিন্তা করতে। মদন রাগে ক্ষোভে ফেসবুক থেকে বেড় হয়ে নতুন গাড়ি নিয়ে লং ড্রাইভে চলে গেল।

কিছুদিন পরে মদনদের এক বড় ভাইয়ের বাচ্চা হল। তাদের বাসাতে দাওয়াতে বসে মদন বলতে ছিল তাদের একটি বাচ্চা নেয়া উচিত কারন বছরে মাত্র দুইটা দিন থাকে উদযাপনের জন্য। স্বামী-স্ত্রীর জন্ম দিন দুটো। কিন্তু সন্তান হলে এটা আরেকদিন বাড়ত। মদনের কথা শুনে ঐ ভাবি বলল আমরা তো সিধান্ত নিয়েছি বছরে ওর দুই দিন জন্মদিন পালন করব। একদিন হল ও যেদিন আমার দেহে এল আরেক দিন হল ও যেদিন এই পৃথিবীতে এলো। এ কথা শুনে মদন লাফিয়ে উঠল। আরে এটা তো চিন্তা করে নি মদন। খুবই ভালো উদ্যোগ। মদন বাসায় ফেরার পথে বউকে বলল দেখেছ বিদেশ আসাতে আমরা কত সামাজিকতা শিখছি। আজ ভাবি যা বললেন এটা বাংলাদেশের কোন আবুলের মাথাতে কখনো আসত?

কিছুদিন পরে মুকুন্দ দাদার বউয়ের ও বাচ্চা হল। ফর্মালিটির জন্য মদন গেল বাচ্চা দেখতে। বাবুর জন্য উপহার দিয়ে বলল বাবা এবার খুব সামান্য উপহার দিলাম এক বছর পরে জন্ম দিনে ভালো উপহার দিব। একথা শুনে বৌদি বলে উঠল না তা হবে না, আমরা বাবুর জন্ম দিন প্রতি মাসেই পালন করব। প্রতি মাসের দশ তারিখেই ওর জন্ম দিন হবে। চাচুদের কিন্তু আসতে হবে। মদন এ কথা শুনে হাসি দিয়ে আসবে বলে বেড় হয়ে গেল। এবার মদন চিন্তাতে পরে গেল প্রতি মাসেই জন্মদিন হলে এত উপহার কীভাবে দিবে সে? মদনের বউ বলল আমাদের বাবু হতে তো আর বেশি দিন দেরি নেই। আমরা ও না হয় প্রতি মাসেই জন্ম দিন করে সেই জন্ম দিনের উপহার কিছু ওদের দিব। এই কথা শুনে মদনের মুখে এক প্রস্থ হাসি ছড়িয়ে পড়ল। মদনের বউ হাসির কারন জানতে চাইলেও সে বলল বাবু হোক তার পরে বলব হাসির কারন।

মদনের একটি ফুটফুটে বাচ্চা হল। বাচ্চা দেখার জন্য মদন সবাইকে দাওয়াত করল। গাড়ি দিয়ে বাসাতে এনে সকলের উদ্দেশ্যে মদন ঘোষণা করলে সে তার বাচ্চার জন্মদিন প্রতি সপ্তাহেই করতে আগ্রহী। তার যুক্তিও অকাট্য। জন্ম দিন মানে যে দিন জন্ম গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ শুক্র/ শনি/ রবি/…/ বৃহস্পতি বার। তাই যেহেতু তার কন্যা শনি বারে জন্মগ্রহণ করেছে এবং ঐ দিন সকলেরই ছুটির দিন সেহেতু আগামী সপ্তাহ থেকে সবাই যেন শনিবারে এসে কেক খেয়ে যায়। এই কথা শুনে এক অসামাজিক ব্যক্তি বলে উঠল তাহলে রাজুর বাচ্চা হলে ও কি করবে। সকলে সমস্বরে বলে উঠল কেন? অসামাজিক ব্যক্তি বলল না মানে মুকুল ভাইয়ের বাচ্চা হল ওনারা বছরে দুই দিন অর্থাৎ গর্ভধারণ এবং ভুমিস্ট দিবস পালন করা শুরু করল। এর পরে মুকুন্দ দাদার বাচ্চা হল তিনি প্রতি মাসেই জন্ম দিন পালনের ঘোষণা দিলেন। আর তুমি দিলে প্রতি সপ্তাহে। ফলে আমার মাথাতে ধরে না রাজু কি করবে? এই কথা শুনে একজন বলে উঠলো মদন তোমাকে না বলেছি সকলের সাথে আমাকে দাওয়াত না করতে। যারা স্ট্যাটাস বুঝে না তাদের বাসাতে ডাক কেন? এই কথা শুনে অসামাজিক ব্যক্তি কিছু না বলে ঐ সমাজ থেকে উঠে চলে গেল। মদন বলে উঠল কোন দাই না চাপরাশির ছেলে পড়াশুনা করে চলে এসেছে ও সামাজিকতার কি বুঝে বলেন ভাই। আমার ভুল হয়েছে ওকে আর কখনো ডাকব না আমার বাসাতে। এই সামান্য সামজিকতার জ্ঞান যার নেই তার আমাদের সমাজে চলার অধিকার ও নেই। এই কথা শুনে সেমি সামাজিক রিপন বলল আমিও উঠিরে মদন তোদের এই সামাজিকতার অত্যাচার আমারও ভালো লাগে না। রাজুর সাথে আমারে না ডাকলেই খুশী হব। আর তোদের মত শিক্ষিত শ্রেণীর এরুপ সামাজিকতার ফলেই আজ বাংলাদেশের এই দশা। তোর ঐ স্ট্যাটাসের কমেন্ট যেটা ডিলিট করেছিলি ওটার স্ক্রিন শট আছে আমার কাছে লাগলে বলিস দিয়ে দিবনে ইনবক্সে বা ওয়ালে। ভ্যালারে মদইন্যা বাইচা থাক চিরকাল। তোদের এই সামাজিকতার বোঝা আমি আর বইতে পারলাম না।

বিদ্রঃ এই গল্পের সকল চরিত্র কাল্পনিক। কারো চরিত্রের সাথে আংশিক ও মিলে যায় তা কাকতালীয় বলে ধরে নিবেন। এই জন্য লেখক দায়ী নয়।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Shares