
যে জায়গায় ঘটনাটা ঘটেছে, সেখানকার গল্পও বাবার কাছে শুনেছি। কী ভাবে অসংখ্য মানুষ নমাজ পড়তেন, কী ভাবে নমাজের পরে জড়িয়ে ধরতেন একে অপরকে, তার প্রত্যেকটা ধাপ আমার জানা। গল্প বলতে বলতে বাবা অনেক সময় খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেন। বলতেন, ‘‘কিশোরগঞ্জ হলো ভালবাসার জায়গা। ওখানে মানুষ মানুষকে বড় বেশি বিশ্বাস করে…।’’ আজ মনে হচ্ছে, এই কি সেই বিশ্বাসের নমুনা? আচমকাই এতটা বদলে যেতে পারে কোনও জায়গা? নাকি বদলের বীজটা অনেক আগেই পোঁতা হয়ে গিয়েছিল?
কিশোরগঞ্জে মুসলিমদের মধ্যে একে অপরকে আক্রমণ তো দূরের কথা, হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যেও কোনও সমস্যার কথা শুনিনি কখনও। বাবা বলতেন, ওখানে ইদ আর দুর্গাপুজোর সময়ে হিন্দু-মুসলিমদের একে অপরকে উপহার দেওয়ার চল ছিল। দুর্গাপুজোয় মুসলমান শিল্পীরা এসে বেহালা বাজাতেন, লোকগান গাইতেন। এই সে দিন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের কথা উঠলে মনে হতো, যেন কোনও রূপকথার জায়গা।
দিল্লির ইনস্টিটিউট অব মাস কমিউনিকেশনস-এ পড়িয়েছি দীর্ঘকাল। সেই সূত্রেই ঢাকায় ‘প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ’-এ পড়াতে গিয়েছি একাধিক বার। প্রত্যেক বারই মনে হয়েছে, কিশোরগঞ্জে যাব। কিন্তু কোনও না কোনও কারণে কোনও বারই সেই যাওয়াটা আর হয়ে ওঠেনি। তবু মনের মধ্যে একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয় হয়ে, স্বপ্ন হয়ে জেগে থেকেছে কিশোরগঞ্জ।
আজকের পরে সেই স্বপ্ন বেশ কিছুটা ধাক্কা খেল। ৮০ পেরোনো এই জীবনটায় স্বপ্ন ভাঙার এই ধাক্কার দামটা আমাকে হয়তো একটু বেশিই চোকাতে হবে।
(লেখক প্রয়াত নীরদচন্দ্র চৌধুরীর পুত্র)