ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে সাম্প্রদায়িক হামলার ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর ছবি প্রকাশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় বহু বাড়িঘর ও মন্দির ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট সব মামলার বিচার শেষ হয়নি। ফলে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর রসরাজ দাস নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে নাসিরনগরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে উপজেলা সদরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করা হয়। একপর্যায়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত ১৫টি মন্দির ও শতাধিক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো কোনো প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির সংখ্যা তিন শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়। হামলার পর আতঙ্কে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
**আট মামলায় একটি রায়**
হামলার ঘটনায় সাতটি মামলা এবং রসরাজ দাসের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একটি মামলাসহ মোট আটটি মামলা হয়। এসব মামলায় প্রায় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ মামলাগুলোর অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়।
২০২৩ সালের ১৬ মার্চ নাসিরনগরের হামলার ঘটনায় করা একটি মামলায় ১৩ জনকে চার বছর করে কারাদণ্ড দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালত। পুরোনো দুর্গামন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা ওই মামলায় প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়। হামলার ঘটনায় এটিই ছিল প্রথম রায়।
তবে একটি মামলার রায় হলেও বাকি মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয়টি মামলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে বিচারাধীন ছিল। অন্যদিকে রসরাজ দাসের বিরুদ্ধে করা মামলাটি পাঠানো হয় চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে।
**রসরাজের মামলা ঘিরে প্রশ্ন**
নাসিরনগরের ঘটনার সূত্রপাতের সঙ্গে জড়িয়ে যায় হরিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা রসরাজ দাসের নাম। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর ছবি প্রকাশের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখনো আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে তাঁকে।
তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, রসরাজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, মুঠোফোন ও মেমোরি কার্ডে সংশ্লিষ্ট ছবির অস্তিত্ব পায়নি পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেন। ফরেনসিক তদন্তের তথ্য ও অভিযোগপত্রের বক্তব্যের মধ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
**১০ বছর পরও কাটেনি আতঙ্ক**
হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিজেদের বাড়িঘর ও উপাসনালয় পুনর্নির্মাণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেছে। তবে অবকাঠামোগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠলেও অনেকের মনে রয়ে গেছে সেই দিনের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা।
ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, হামলার নেপথ্যে থাকা উসকানিদাতা ও প্রত্যক্ষ হামলাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নাসিরনগরের সেই ঘটনার এক দশক পেরিয়ে গেলেও সব মামলার বিচার শেষ হয়নি। একটি মামলায় দণ্ডাদেশ হলেও বাকি মামলাগুলোর নিষ্পত্তি, রসরাজ দাসের মামলার পরিণতি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের বিষয়গুলো এখনো আলোচনায় রয়েছে। ১০ বছর পরও তাই বিচার ও নিরাপত্তার প্রত্যাশায় দিন কাটছে নাসিরনগরের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর।
