The voice of Brahmanbaria || Local news means the world is

জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ::মো. ফজলুল কাদের চৌধুরী

ভাষা আন্দোলনের সাথে আহমদ রফিক নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি একাধারে ছিলেন ভাষাসংগ্রামী (তিনি নিজেকে একজন ‘ভাষাসৈনিক’ মনে করতেন না বরং ‘ভাষাসংগ্রামী’ হিসেবে পরিচয় দিতেই পছন্দ করতেন), রবীন্দ্রগবেষক, কবি, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক। সুদীর্ঘ সাত দশকের লেখালেখির জীবনে তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যের উপরই রয়েছে তাঁর বিশটিরও অধিক গ্রন্থ। তিনি যে শুধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই গবেষণা করেছিলেন তা নয়; নজরুল, বুদ্ধদেব বসু, শামসুর রাহমানসহ অনেককে নিয়েই লিখেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রবীন্দ্রচর্চাকেন্দ্র ট্রাস্ট।

কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’(১৯৯৫); পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৯), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫), অগ্রণী ব্যাংক শিল্পসাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা। ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন দুই বার (২০১৬,২০২২)। কলকাতার ‘টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ থেকে পেয়েছেন ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি (১৯৯৭)।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই কৃতি সন্তানের জন্ম সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামে ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। আমৃত্যু সাহিত্যসাধনা করে যাওয়া এই গুণী ব্যক্তি ৯৬ বছর বয়সে ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর পরলোকে গমন করেন।

এই শাহবাজপুরেই জন্মেছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সরাসরি বিরোধিতাকারী, পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও একমাত্র উপ-রাষ্ট্রপতি নূরুল আমীন। শুধু ভাষা আন্দোলনই নয়, নূরুল আমীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেরও বিরোধী ছিলেন। অন্যদিকে আহমদ রফিক ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একজন অন্যতম সক্রিয় সংগঠক। ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র থাকাকালীন ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করায় পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। ঢাকা মেডিকেলের ভাষা আন্দোলনকারীদের মধ্যে একমাত্র তাঁর বিরুদ্ধেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। একই কারণে একমাত্র আহমদ রফিককেই বঞ্চিত করা হয় ‘ইন্টার্ন’ করার সুযোগ থেকে। ফলশ্রুতিতে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করার পরও পেশা হিসেবে চিকিৎসাকর্তব্য বেছে নেয়ার সুযোগ তাঁর ছিল না। বেছে নিয়েছিলেন লেখালেখির জীবন।

একজন প্রথম সারির রবীন্দ্রগবেষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। পাশাপাশি লিখেছেন ভাষা আন্দোলন নিয়ে, লিখেছেন দুই বাংলার বিভাজন নিয়ে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রজীবন’ গ্রন্থের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ড আহমদ রফিক রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। তিনি জীবিত থাকতেই বাংলা একাডেমি তাঁর রচনাবলি প্রকাশ করেছিল। পূর্বে কখনই কোনো লেখকের জীবদ্দশায় ঐ লেখকের রচনাবলি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেনি।

নির্মোহ আহমদ রফিক তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করে তা ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং অনেককেই দান করে গেছেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন ডা. এস. কে. রুহুল হাসিন। নিঃসন্তান ছিলেন এই দম্পতি। ২০০৬ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাই নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে হয়েছে তাঁকে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ কেন্দ্রীয় সংগ্রামীদের মধ্যে সর্বশেষ জীবিত ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তিনিও চলে গেলেন ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর। আহমদ রফিকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

মো. ফজলুল কাদের চৌধুরী
শাহবাজপুর,সরাইল,ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
মোবাইল নং- ০১৮১৮৭১০৭০২/ ০১৬৩০৫১৬৮৪৯

Exit mobile version