Main Menu

তালেবানের সঙ্গে আমার জীবন

+100%-

আবদুস সালাম জায়েফ। ১৯৯০ সালে সংঘটিত তালেবান আন্দোলনের একজন অফিসিয়াল মুখপাত্র। আমেরিকা সরকার পরবর্তীতে তাকে কারাবন্দি করে এবং কুখ্যাত গুয়ান্তানামো কারাগারে প্রেরণ করে। গুয়ান্তানামোতে বসেই তিনি ‘তালেবানের সঙ্গে আমার জীবন’(গু খরভব রিঃয ঃযব ঞধষরনধহ) রচনা করেন। ২০১০ সালে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউইয়র্ক বইটি প্রকাশ করেছে। সাপ্তাহিক লিখনীর পাঠকদের জন্য আমরা ধারাবাহিকভাবে তা প্রকাশ করছি। বাংলায় এর অনুবাদ করেছেনÑ
আবদুল্লাহ বাতিনতালেবানের সঙ্গে আমার জীবনযুদ্ধ যখন আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পৌঁছল, তখন পর্যন্ত আমি বিভিন্ন দেশের দূতের সঙ্গে মিটিং করছি। সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত তালেবান সরকারের জন্য তাদের স্বীকৃতি তুলে নিলো। তাদের দেশ থেকে আমাদের দূতদের বহিষ্কার করলো। এখন একমাত্র পাকিস্তানের স্বীকৃতি অবশিষ্ট রইলো।
রমজান শুরুর দুদিন আগে ১৫ নভেম্বর আমি আবার আমিরুল মুমিনিনের সঙ্গে দেখা করার জন্য কান্দাহারে গেলাম। তার সঙ্গে আমেরিকা এবং আফগানের মধ্যে কোনো আলোচনা সম্ভাব কি না জানতে চাইলাম। তালেবান এবং আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার জন্য কাতার মধ্যস্ততা করতে রাজি হলো। আমি আমার ল্যান্ড ক্রুইজারে চড়ে ইসলামাবাদ ত্যাগ করলাম। সারা পথে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আমাকে অনুসরণ করলো। আমি যখন চামান সীমান্ত ক্রস করলাম, তখন আমার মনে হলো, পাক সরকার হয়তোবা আমাকে আর পাকিস্তানে ফিরতে দেবে না।
আমি কান্দাহারে পৌঁছে দেখলাম, সারা শহরে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছে। দুদিন আগে কাবুলের পতন হয়েছে। কান্দাহারের ওপরেও সেই দুঃখের মেঘ ছড়িয়ে পড়েছে। আমি সরাসরি তালেবান সদর দপ্তরে চলে এলাম, যেটি শহরের মধ্যে একটি নতুন ভবনে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আমি মোল্লা মোহাম্মাদ ওমরের সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম। তিনি অফিসে ছিলেন। কিছু সময় অপেক্ষা করলাম। আমার চলে আসার এক ঘণ্টা পর সদর দপ্তরে আমেরিকার সৈন্যরা হামলা করলো। বিমান হামলার কারণে স¤পূর্ণ ভবন ধ্বংস হয়ে গেলো। সৌভাগ্যক্রমে একজন মানুষও নিহত হয়নি। আমার সদর দপ্তর পরিত্যাগ এবং হামলার ঘটনা কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিলো। তাই মোল্লা ওমর ভাবলেন, আমি আমেরিকান সৈন্যদের নজরদারিতে আছি। তাই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তার জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে।
আমি মোল্লা ওমরের পুরাতন বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, যেটি একটি পুরাতন জিহাদি মাদরাসার কাছে অবস্থিত ছিলো। এমতাবস্থায় আমার গাড়ির কাছেই আরেকটি বিমান হামলা ঘটল। ক্রুইজ মিসাইলের শব্দে আমার সঙ্গে থাকা স্যাটেলাইট ফোনটি নষ্ট হয়ে গেলো। দ্বিতীয় আক্রমণের পর মোল্লা ওমর বুঝতে পারলেন, আমাকে নিশ্চয়ই অনুসরণ করা হচ্ছে। হয়তোবা এটা সত্য ছিলো, অথবা এটা আমার স্যাটেলাইট ফোনের সঙ্গে জড়িত। একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। কয়েক মিনিট পর রুশ-বার্তা সংস্থা তাস থেকে সংবাদ পরিবেশন করা হলো, পাকিস্তানে নিযুক্ত আফগানের রাষ্ট্র্র্রদূত সাহেব আমেরিকার মিসাইল আক্রমণে কান্দাহারে নিহত হয়েছেন। এটা ছিলো একটি সংক্ষিপ্ত নিউজ বুলেটিন। রাশিয়ার এটা প্রচারের কারণ স¤পর্কে আমি অবগত ছিলাম।
আমার সঙ্গে মোল্লা ওমরের দেখা হলো না। তাই আমি তাইয়েব আঘা সাহেবের মাধ্যমে একটি খবর মোল্লা ওমরকে দিয়ে এলাম। রমজানের তৃতীয়দিন আমি কান্দাহার ত্যাগ করে কোয়েটার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। আরগেস্তান ব্রিজ পর্যন্ত কয়েকজন তালেবান আমাকে এগিয়ে দিলেন। আরগেস্তান ব্রিজে আসার পর আমি সকল বন্ধুদের বিদায় জানালাম। আমি কান্দাহারের দিকে তাকিয়ে একটু প্রার্থনা শুরু করলামÑ
হে সুন্দর শহর, তোমার বুকে আমরা অবুঝ শিশুর মতো হামাগুড়ি দিচ্ছি। একমাত্র আল্লাহ জানেন, তোমার সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে। একমাত্র আল্লাহ জানেন, তোমার ভাগ্যে অথবা আমার ভাগ্যে কী আছে। আমি জানি, তোমার সঙ্গে আমার এ বিচ্ছেদ অনেক দীর্ঘ হবে। আমি ভীত, যে হয়তো বা এ পথ আর অতিক্রম করতে পারবে না। আমার ভয় হয়, এ সুন্দর শহর, সুন্দর ফুলের বাগান, সুন্দর ঘর সবকিছু যুদ্ধের নির্মম আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।
তালেবানরা আমার কথা শুনে হাসছিলো। তারা আমাকে প্রশ্ন করলোÑ আমি কেন এতো বেশি সিরিয়াস হয়ে অদ্ভুত কথা বলছি। আমি কোনো উত্তর দিলাম না। তারা কান্দাহার চলে গেলো। আমি ¯িপন বলডাক সীমান্ত অতিক্রম করে সামনে আগাতে থাকলাম। ওয়েশ নামে পাকিস্তানি সীমান্তে পৌঁছার পর আমাকে এন্ট্রি ভিসা প্রদানে অনেক দেরি করা হলো। তাতে রাত প্রায় নয়টা বেজে গেলো। কোয়েটায় পৌঁছতে আমার অনেক রাত হয়ে গেলো। এদিন রাত সেখানে অবস্থিত আমাদের কনস্যুলেটে কাটালাম। পরের দিন সকালে আমি বিমানবন্দর থেকে একটি বিমানে চড়ে ইসলামাবাদে গিয়ে অবতরণ করলাম।
কান্দাহার প্রদেশ, আরগেস্তান ব্রিজ আমি বিমান বন্দরে পৌঁছার পর একদল সাংবাদিক আমাকে ঘিরে ধরলো। আমি একটু সময় নিয়ে
তাদের প্রশ্নের উত্তর দিলাম। আমি যদিও আমার কূটনীতিক পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণ করছিলাম, তারপরও কর্তব্যরত পুলিশ আমাকে অনুসন্ধান করলো। তাদের বলা হয়েছে, একটি লোকও যেনো তদন্ত ছাড়া যেতে না পারে। তারা বললোÑ পাকিস্তানের অবস্থা অনেক খারাপ।
আমি ২০ নভেম্বর ইসলামাবাদ গিয়ে পৌঁছলাম। একমাত্র কারণ ছিলো আমি যেনো পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিতে পারি। কারণ তারা ইসলামিক এমিরেটস অব আফগানকে আর স্বীকার করলো না। আমাকে এবং অন্যান্য কর্মকর্তাকে আফগানের অবস্থা উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সেখানে বসবাস করতে অনুমতি দিলো।
পাক সরকার কর্তৃক মিডিয়াতে কোনো ধরনের বিবৃতি প্রদান থেকে আমাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হলো। আমি যেখানেই যেতাম, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সেখানেই আমাকে অনুসরণ করতো। আমার বাড়ির সামনে একটি ল্যান্ড ক্রুইজার ও একটি মোটর বাইক সবসময় থামানো থাকতো। তারপরও আমার সঙ্গে অনেক মানুষ দেখা করতে আসতো।
আফগানে বোম্বিং শুরু হওয়ার একদিন পর আমার বাসায় একজন পশতুন ডাক্তার এসে আমার গার্ডকে বললো, আমি যেনো কোনো শব্দ না করে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাই। কারণ আমায় ছেড়ে যাওয়ার এখনই প্রকৃত সময় বলে তিনি জানালেন। ভদ্রলোক আমাকে জানালেন, সীমান্ত এলাকায় আমি একটি বাগানবাড়ি বানিয়েছি। সেখানে আপনাকে নিয়ে যাবো। আপনি সেখানে কিছুদিন অবস্থান করবেন। পাকিস্তান সরকার আপনাকে সহ্য করবে না। তারা আপনাকে আমেরিকার হাতে তুলে দিতে পারে। কারণ পাক সরকার আমেরিকার কাছে ঋণী। আমি তাকে তার এ সুপরামর্শের জন্য ধন্যবাদ জানালাম। এবং তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করলাম।
আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত এবং পাকিস্তান দূতাবাসের কাছে অনুরোধ পাঠালাম। তারা আমাকে কোনো উত্তর দিলো না। আমি ব্রিটিশ এবং ফ্রেঞ্চ দূতাবাসের কাছেও গেলাম। তাদের কাছ থেকেও কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না। এমনকি জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক দূতাবাসের (টঘঐঈজ) কাছে আশ্রয়ের জন্য নাম রেজিস্টার করলাম। তারা আমাকে একটি ডকুমেন্ট দিলো, যার মেয়াদ ছিলো মাত্র একমাস। তারা বললো, আমার যেকোনো সময়ে তারা আমাকে সাহায্য করবে। এ সকল নিশ্চয়তা সত্ত্বেও আমি উদ্বিগ্ন ছিলামÑ গ্রেফতারের চেয়েও অন্য কোনো ভীষণ বিপদ আমার ওপর আপতিত হতে পারে। এমনকি আমাকে হত্যাও করা হতে পারে। আমার গ্রেফতার নিয়ে তেমন কোনো কথা শোনা যাচ্ছিলো না। কারণ পাকিস্তানের জন্য আমাকে হত্যা করা ছিলো একটি সাধারণ ব্যাপার। তারা নিজেরা হত্যা করে খুব সহজেই অন্য একজনকে দায়ী করে দেবে। আর এটা ছিলো পাকিস্তানের জন্য একটি সাধারণ আচরণ। আমার কাছে এমন সন্দেহও হলোÑ পাকিস্তান আমাকে এক টুকরা হাড়ের মতো আমেরিকার হাতে নিক্ষেপ করবে। আমি কোথাও যেতে পারতাম কিন্তু মাসুদ গ্রুপের হাতে প্রতিনিয়ত বন্দি হওয়া তালেবান সদস্যদের বিষয়ে আমার জনসম্মুখে কথা বলাটা অনেক জরুরি ছিলো।
প্রতিদিন পাকিস্তানে আমার অবস্থার অবনতি ঘটছিলো। লিবিয়ার দূতাবাস ২৪ ডিসেম্বর তাদের দেশের ৪২তম স্বাধীনতা দিবস পালন উপলক্ষে মারিয়ট হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমাকে নিমন্ত্রণ করা হলো। প্রেসিডেন্ট মোশাররফও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে
দেখলাম, তিনি অনেক দূত এবং কর্মকর্তা দ্বারা বেষ্টিত হয়ে আছে। আমি তাকে পাশ কাটিয়ে কোনো ধরনের অভিভাদন বিনিময় ব্যতিরেকে ভিড়ের মধ্যে গিয়ে বসে পড়লাম।
ইসলামি দেশের অধিকাংশ দূতবৃন্দ আমার কাছে এসে সালাম বিনিময় করলো। ইরানি দূত আমার পাশেই বসলো। তারা আফগানের অবস্থা স¤পর্কে জানতে চাইলো। আমার ব্যক্তিগত অভিমত জানতে চাইলো। আমি রাতের খাবার খেয়ে দ্রুত সে জায়গা পরিত্যাগ করলাম।
তখনকার সময়ে ইসলামাবাদের সকল হোটেলই সাংবাদিকে পূর্ণ থাকতো। আর মারিয়ট হোটেল ছিলো সবসময় সাংবাদিকে ঘেরা। আমি যখন হোটেলের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম, কয়েকশ সাংবাদিক মৌমাছির মতো আমাকে ঘিরে ধরলো। আমি তাদের কথা অগ্রাহ্য করে হোটেলের মধ্যে ঢুকলাম। তখন তারাও আমাকে অনুসরণ করে লবির মধ্যে ঢুকতে লাগলো। এতো সাংবাদিকদের একসঙ্গে ঢুকতে দেখে অন্য দূতেরা একটু আতঙ্কিত হয়ে গেলেন।
মোশাররফ নিরাপত্তা রক্ষীবেষ্টিত হয়ে জায়গা ছেড়ে এক রুম থেকে অন্য রুমে যেতে লাগলো। অল্প সময়ের মধ্যেই পুলিশ চলে এলো। হোটেল থেকে বের হয়ে বাসায় আসা পর্যন্ত তারা আমাকে পাহারা দিতে লাগলো। পরের দিন পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা যিনি মোশাররফের সঙ্গে গতদিনের অনুষ্ঠানে ছিলেন, আমাকে বললেনÑ পাকিস্তান সরকার সম্ভবত আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তারা হয়তো বা আপনাকে গুপ্ত হত্যা করবে বা জেলে ঢোকাবে। আপানাকে হত্যা করার সম্ভাবনাই বেশি।
আমি জানি, এ কথার দ্বারা মোশাররফ কী বোঝাতে চাচ্ছে। তবে এর আগেও অনেকবার আমার বিরুদ্ধে মোশাররফকে হত্যার অভিযোগ ওঠানো হয়েছিলো। আইএসআই আমাকে বললো, এ পরিকল্পনার ব্যাপারে তাদের কাছে তথ্য প্রমাণ আছে। আমাকে এর জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আমি বললাম, আমি জীবনে কখনো কাউকে হত্যা পরিকল্পনা করিনি। আমি যেদিন ৭০০ আলেমের একটি সম্মিলিত ফতওয়া মিডিয়াতে প্রকাশ করে দিলাম, সেদিন থেকে আমি মোশাররফের চোখের বালিতে পরিণত হয়েছি। ওলামাদের ফতওয়ার কিছু অংশ ছিলো এ রকমÑ
যারা আফগানে আক্রমণরত আমেরিকাকে কোনো ধরনের সাহায্য করবে, তারা নিঃসন্দেহে গুনাহের মধ্যে জড়িয়ে পড়বে। এবং সে মুবাহুদ দম বা তার রক্ত হালাল হয়ে যাবে। তাকে যে কেউ হত্যা করতে পারবে।
প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত একজন পাকিস্তানি সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করলো, মোশাররফ পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং তিনিই আমেরিকান সৈন্যদের ঘাঁটি দিয়েছেন। তিনি গোয়েন্দা সংস্থাকে আমেরিকার জন্য তথ্য সরবরাহে সহায়তা করতে বলেছেন। সুতরাং তিনি কি এ ফতওয়ার অধীনে পড়বেন? ফতওয়াটি সাধারণ। এটা কাউকে বিশেষভাবে টার্গেট করে না এবং কাউকে বাদও দেয় না। কোনো বিশেষ ব্যক্তির জন্য শরিয়তের ফতওয়া পরিবর্তন করতে পারবেন না। সবাইকে ইসলামি শরিয়তের সঙ্গে একমত হয়ে চলতে হবে। আমি তাকে এ ব্যাখ্যা দিলাম। আমি এ ঘোষণা দেয়ার পর থেকে আরও বেশি বিপদ অনুভব করতে লাগলাম।
কান্দাহারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এমিরেটসের সর্বশেষ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও শেষ হয়ে গেলো। আমি তখন পর্যন্ত ইসলামাবাদে অবস্থান করছি। তালেবান নেতৃবৃন্দ এবং বন্ধুদের সঙ্গে আমার আর কোনো যোগাযোগ ছিলো না। তাদের ভাগ্যে যে কী ঘটলো, আমি বলতে পারলাম না। আমি তাদের অবস্থা স¤পর্কে জানার  চেষ্টা করলামÑ কে নিহত হয়েছে? কারা দস্তুম এবং মাসুদ গ্রুপের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। আর আমি একাকী হয়ে পড়লাম। কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আমার করণীয় নিয়ে আলোচনা করলাম। তারা আমাকে টঘঙঈঐঅ (জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা) এর কাছে আশ্রয় লাভের আবেদন করতে বললো। আমি তাদের অফিসে গিয়ে নাম নিবন্ধন করার আগেই একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা আমাকে অনেক ধরনের প্রশ্ন করলো। পুরুষ লোকটি ছিলো খাটো এবং কালো রঙের। আমি যখন তার পদবি এবং জন্মস্থান স¤পর্কে জানতে চাইলাম, তিনি জানালেন, তিনি জাতিসংঘের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা এবং আমেরিকায় তার জন্ম। আমি মহিলাকে বললাম, তাদের প্রশ্নগুলো আমার কাছে তদন্তের মতো মনে হচ্ছে। মহিলা আমাকে বললো, আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। এমনকি আপনার জন্য আরও অনেক প্রশ্ন অপেক্ষা করছে। আমি তখন তার কথার মর্মার্থ বুঝতে পারিনি। যেদিন আমাকে একজন আমেরিকার পশুর হাতে তুলে দেয়া হয়, সেদিন আমি তার কথার মর্ম বুঝতে পারলাম। এ সকল ঘটনা যখন চলছিলো, তখন আমি অল্প কিছু সময়ের জন্য কোয়েটা গিয়েছিলাম। টঘঙঈঐঅ থেকে আমার কাছে একটি সংবাদ পৌঁছল, আমাকে ইসলামাবাদে ফিরে আসতে হবে এবং তারা আমাকে আশ্রয় দেবে না। ইসলামাবাদে আমার বাসায় আসার পর আমার স্ত্রী বললো, আমাকে এ জায়গা ছেড়ে দেয়া উচিত। আমার স্ত্রী উদ্বিগ্ন ছিলো আমাকে পাক সরকার কর্তৃক গ্রেফতার করা হতে পারে। আমার অনেক বন্ধুরা আমাকে পালাতে বললো। আমার জন্য পালানোর কাজটি ছিলো অনেক কঠিন। এটা উত্তর প্রদেশে যে সকল তালেবান মাসুদ গ্রুপের হাতে বন্দি হয়েছে, তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হলো। আমি ২৫ হাজার নিহত আফগানের কথা চিন্তা করলাম, যারা আমেরিকার বোমার আঘাতে নিহত হয়েছে। এবং আরও অসংখ্য মানুষকে জেলে ঢোকানো হয়েছে। আমি যদি তাদের মতই ভাগ্যবরণ করি তাহলে দোষ কী? আমি তাদের পেছনে ফেলে পালাতে পারি না। আমি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। আমি মাসুদ গ্রুপের যারা পাকিস্তানে বাস করতো, তাদের সঙ্গে আটক তালেবানদের স¤পর্কে আলোচনা চালিয়ে গেলাম। এমনকি টাকা দিয়ে তথ্য বের করে আনতাম। আমি ওই সকল কমান্ডারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত স¤পর্ক ব্যবহার করে তাদের টাকা দিয়ে বলতাম, তারা যেনো আটক তালেবানদের বাঁচিয়ে রাখে। এ কাজে আরও সফল হওয়ার জন্য আমি রেডক্রস (একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা) এবং আরও অনেক মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার সঙ্গে কারাবন্দি লোকদের রক্ষার জন্য আলোচনা চালিয়ে গেলাম। আমি মাসুদ গ্রুপের আফগানের নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। তাদের কারাবন্দি লোকদের মুক্তি দেয়ার জন্য বললাম। আমি এ সকল কাজ করতে গিয়ে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ১৮০,০০০ ডলার খরচ করে ফেললাম। এবং খুব সামান্য ফল পেলাম। প্রত্যেক মুহূর্তে আমি গ্রেফতার আতঙ্কে থাকতাম, পালাতে পারলাম না। আমি পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে আমার আশ্রয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলাম। তারা আমাকে জানালো, এ ব্যাপারে তারা আলোচনা করছে। তাতে আমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই। কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে নাÑ তারা আমাকে জানালো। একই সময়ে হয়তো বা তারা আমেরিকার সঙ্গে আমার মূল্য নিয়ে দরকষাকষি করছিলো। ইদের পর আইএসআই আমার ওপর তাদের গোয়েন্দা নজরদারি আরও বৃদ্ধি করে দিলো। আমার বাসার চারপাশ আটকিয়ে দেয়া হলো। যখনই আমার বাসা থেকে কোনো গাড়ি বের হতো, তারা সেটা তল্লাশি করে দেখতো, আমি পালাচ্ছি কি না।॥