Main Menu

আজ সেই দুঃসহ স্মৃতিজাগানিয়া ২৫শে ফেব্রুয়ারিঃ বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা কর্মকর্তা হত্যাযজ্ঞের তিন বছর অ

+100%-

ঢাকাঃ ২০০৯ সালের এদিনে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা দুনিয়ার ইতিহাসে সেনাকর্মকর্তা হত্যার এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছিল। ওই বছরের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত নির্মম ট্র্যাজেডি দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয়কে যেন ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। দিনটি স্মরণে শনিবার সরকারিভাবে ‘পিলখানা হত্যা দিবস’ পালন করা হবে।

সেদিন পিলখানায় অপারেশন ডাল-ভাত কর্মসূচির দুর্নীতি নিরসন, বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ মিশনে অন্তর্ভুক্তি, বিডিআরের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাহিনী পরিচালনাসহ বেশ কয়েকটি দাবির নামে বিদ্রোহ ঘোষণা করে কিছু জওয়ান। ঘটনার পরপরই দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সাবেক সচিব আনিস-উজ-জামানকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়।
২০০৯ সালে এই বিদ্রহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৫জন নিহত হয়। আহত ও লাঞ্ছিত হন অনেকেই। ঘাতকদের হাত থেকে সেদিন রেহাই পায়নি গৃহপরিচারিকা, রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা, শিক্ষার্থীসহ নিরীহ সাধারণ মানুষও। দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিডিআরের হাজার হাজার পরিবার। এ অভিশাপ কেবল ভুক্তভোগী সেনা ও বিডিআর সদস্যদের পরিবারই নয়, গোটা জাতিকেই তা বহন করতে হচ্ছে। স্তম্ভিত হয়ে যায় বিশ্ববিবেক। বিশ্বের ইতিহাসে এমন নৃশংস ঘটনার নজির আর নেই। অজানা আতঙ্কে গোটা জাতি ছিল সেদিন উৎকণ্ঠিত।
কিন্তু এটা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডই ছিল না এটি ছিল স্পষ্টত আমাদের সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করার একটি সফল অভিযান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও কোনো দেশের একসঙ্গে সেনাবাহিনীর এতো কর্মকর্তা হারানোর নজির নেই যা সেদিন পিলখানায় হয়েছিল। রক্তাক্ত সময়ের দীর্ঘ তিন বছর পরও দেশবাসীর মন থেকে কিছুতেই মুছে যায়নি সেই দুঃসহ স্মৃতি। থামানো যায়নি স্বজনহারাদের সেই কান্না। বিদ্রোহের পর বিডিআরের আইন, নাম, পোশাক, পতাকা ও মনোগ্রামসহ অনেক কিছুই পাল্টে দেয়া হয়েছে। বিডিআরের নিজস্ব আইনে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সেক্টর অথবা ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে এবং ফৌজদারি আইনের মামলার পৃথক দুটি চার্জশিটে আসামিদের বিচার কাজ চলছে।
২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পিলখানার বিডিআর সদর দফতরে রাইফেলস সপ্তাহের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বর্ণাঢ্য ওই আয়োজনের দ্বিতীয় দিন। ২৬ ফেব্রুয়ারি নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন আর উৎসবের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল রাইফেলস সপ্তাহ। কিন্তু তার আগেই ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটে যায় এক করুণ মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ। সেদিন সকাল ৯টায় যথারীতি পিলখানার দরবার হলে বসেছিল বার্ষিক দরবার। সারাদেশ থেকে আসা বিডিআরের জওয়ান, জেসিও, এনসিওসহ বিপুল সদস্য তখন পরিপূর্ণ গোটা দরবার হল। দরবার হলের মঞ্চে তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমদসহ বিডিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সকালে আনন্দ মুখর পরিবেশে শুরু হয়েছিল দরবারের নিয়ম মাফিক কর্মসূচি। দরবার হলে সবাই সারিবদ্ধভাবে বসেছিলেন। সামনে ছিলেন বিডিআর ডিজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দরবার হলের আলোকিত পরিবেশ রূপ নেয় ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে।
হঠাৎ দরবার হলের দক্ষিণ-পূর্ব দরজা দিয়ে রান্নাঘরের দিক থেকে অস্ত্রহাতে ঢুকে পড়ে একজন। তার পিছু পিছু আরও দু’জন। পরে জানা যায়, প্রথম যিনি অস্ত্রহাতে দরবার হলে ঢুকেছেন, তার নাম সিপাহি মাইন। তার পিছু পিছু আরো যে দু’জন ঢুকেছিলেন তারা হচ্ছেন সিপাহি কাজল আলী ও এবি সিদ্দিক। তারা সবাই ১৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সদস্য। দরবার হলের মঞ্চে উপবিষ্ট তখনকার মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের দিকে অস্ত্র তাক করে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করে সিপাহি মাইন। এ সময় দ্রুতগতিতে তখনকার ডিডিজি ব্রিগেডিয়ার এমএ বারী অন্য কর্মকর্তাদের সহায়তায় তাকে নিরস্ত্র করেন। পরে কাজল আলী ও এবি সিদ্দিক দরবার হল থেকে পালিয়ে যায়। এ অবস্থায় দরবারে অবস্থানরত জওয়ানদের একজন জাগো বলে চিৎকার করে ওঠে। এ সময় মেগাফোনধারী মুখোশ পরা সশস্ত্র ৫ যুবক দরবার হলে প্রবেশ করে ব্রাশফায়ার শুরু করে। হঠাৎ গুলির শব্দ। এরপর ক্ষণিকের নীরবতা, সবাইকে থামানোর চেষ্টা করেন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমদ। তার কথায় কেউ কর্ণপাত করেনি। গুলি চলতে থাকে অবিরাম। সব উৎসব-অনুষ্ঠান ম্লান করে দিয়ে প্রায় দুই দিন ধরে চলে বিদ্রোহ। নারকীয় তাণ্ডবে মেতে ওঠে একদল বিডিআর জওয়ান।
বিদ্রোহী ঘাতকরা তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমদকে দরবার হল থেকে টেনেহিঁচড়ে সামনের রাস্তায় নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। প্রায় একই সময় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় ৬ সেনা কর্মকর্তাকে। বিদ্রোহের নামে পৈশাচিক উন্মাদনায় রক্তের হোলিখেলায় মেতে ওঠে তারা। অস্ত্রাগার ভেঙে ভারি অস্ত্র নিয়ে সদর দফতরের ভেতরে কর্মকর্তাদের বাসায় বাসায় ঢুকে হামলা ও লুটপাট চালায় ঘাতকরা। ডিজির বাসায় ঢুকে তার স্ত্রী নাজনীন শাকিল ও গৃহপরিচারিকাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সে দিন তার বাসায় বেড়াতে আসা স্বজনরাও রক্ষা পায়নি ঘাতকের হাত থেকে। ভেতরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চললেও বিদ্রোহীদের একটি দল ভারী অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় বিভিন্ন গেটে। ৩ নম্বর গেট দিয়ে বিদ্রোহীরা মর্টার শেল ছুড়তে থাকে। পিলখানার প্রবেশ পথগুলোতে আর্মড কারসহ গোলাবারুদের গাড়ি ও এসএমজি বসিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি চালানো হয়।
পিলখানা হত্যার সেই বীভৎসতা সমগ্র জাতির কাছে কলঙ্কিত এক ইতিহাস। শতাধিক সেনা পরিবার বিডিআরের বিপথগামী ঘাতকদের হিংস্র পৈশাচিক থাবায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতিম হয় অনেক শিশু। অর্ধশতাধিক নারী হয়েছিলেন বিধবা। বহু পিতা-মাতার বুক খালি হয়। এই অভিশাপ কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোরই নয়, গোটা দেশ ও জাতির। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে পিলখানা বিডিআর সদর দফতরে নজিরবিহীন নৃশংসতার পর ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকালের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। দু’দিনের বিভীষিকা থামিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করে বিদ্রোহীরা। আগেই পালিয়ে যায় প্রকৃত খুনিরা।
মৃত্যুপুরী
প্রায় ৩৬ ঘণ্টা বিদ্রোহের পর পিলখানা পরিণত হয় একটি মৃত্যুপুরীতে। পিলখানায় শুধু লাশ আর লাশ। রক্ত আর রক্ত। পোড়া গাড়ি, পোড়া বাড়ি, ভাঙা গ্লাস, ঘাসের ওপর তাজা গ্রেনেড, চারদিকে শুধু ধ্বংসচিহ্ন। সেনা কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারগুলোর তছনছ অবস্থা। বিভিন্ন স্থাপনায় জ্বালাও-পোড়াওয়ের দৃশ্য। ড্রেনের ম্যানহোল থেকে আসে রক্তের উৎকট গন্ধ।
২৫ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ও রাতে পিলখানায় যে হত্যাযজ্ঞ আর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। নির্বিচারে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার পর লাশ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে খোদ ঘাতকরা। তাই আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে চলতে থাকে লাশ গুমের কাজ। পিলখানার ভেতর বিশেষ মেশিন দিয়ে লাশগুলো ধ্বংস করার ব্যর্থ চেষ্টা হয় বলে পরে জানা গেছে। কয়েক সেনা কর্মকর্তার লাশ ফেলে দেয়া হয় ম্যানহোলে। পরের দিন সেগুলো বুড়িগঙ্গার কামরাঙ্গীরচর পয়েন্টে ভেসে উঠলে আর কিছুই বুঝতে বাকি থাকে না কারও। বাকি লাশ গুম করতে একের পর এক গণকবর খোঁড়া হয়। পিলখানা পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। প্রথম দফায় কামরাঙ্গীরচরে একটি স্যুয়ারেজ লাইন থেকে কয়েক দফায় ৯ সেনা কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হাসপাতালের পেছনে একটি গণকবর থেকে তোলা হয় একসঙ্গে ৩৯টি লাশ। একটি গ্যারেজ মাঠের পাশের গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয় আরো নয়টি লাশ। এ বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক ও দু’জন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীসহ ৬১ জন নিহত হন। সেনা কর্মকর্তাদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান সাত বিডিআর জওয়ান। বিভিন্ন গেট থেকে ফাঁকা গুলি ছোড়ায় আশপাশের আরও ৭জন পথচারী নিহত হন। এ ঘটনায় সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫ জনে।
বিচার
বিদ্রোহে জড়িত থাকার অভিযোগে ছয় হাজার জওয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে চার হাজার ৪৭ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তাদের মধ্যে ঢাকায় তিন হাজার ৪৬৩ ও ঢাকার বাইরে ৫৮৪ জন। এছাড়া ফৌজদারি অভিযোগ তদন্ত সংস্থা সিআইডি গ্রেফতার দেখায় প্রায় দু’হাজার ৩০০ জনকে। টাস্কফোর্স ফর ইন্টারগেশন (টিএফআই) সেলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় দু’হাজার ২৮০ জনকে। পাঁচ শতাধিক জনের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়। পরবর্তীতে ৩০০ শতাধিক আসামি ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করে।
বিচার শরু হওয়ার এক পর্যায় হঠাৎ করেই রিমান্ডে নেয়া বিডিআর সদস্যদের মধ্যে তথাকথিত আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয় আশঙ্কাজনক হারে। কথিত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েও অনেকের মৃত্যু হয়। যদিও সরকার অস্বাভাবিক এসব মৃত্যুর বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটি করে। বিদ্রোহের পর নিরাপত্তা হেফাজতে মারা যাওয়া প্রায় ৭৫ জওয়ানের কেউ নির্যাতনে মারা যায়নি বলে রিপোর্ট দেয় সরকারি তদন্ত কমিটি। তাদের মধ্যে নয় জন আত্মহত্যা ও অন্যদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বিদ্রোহের পরপরই পলাতক বিডিআর সদস্যদের গ্রেফতার, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য দেশজুড়ে অপারেশন রেবলহান্ট পরিচালনা করা হয়। কিন্তু এতে তেমন কোনো সফলতা আসেনি। বিদ্রোহের দুই বছরের মাথায় এসে দুটি ক্যাটাগরিতে বিচার কাজ চলছে। একটি বিডিআরের নিজস্ব আইনে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সেক্টর ও ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে স্থাপিত আদালতের মাধ্যমে। এতে তদন্ত শেষে পিলখানার নয়টিসহ ৫৮টি ইউনিট বিদ্রোহে অংশ নেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজে অংশগ্রহণকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা হয়েছে। সেনা কর্মকর্তাদের বাসায় ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতনের মতো নৃশংস সব ঘটনা একের পর এক প্রকাশিত হয়। দরবার হলের সিসি টিভিতে রক্ষিত ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন আলামত থেকে ঘাতকদের শনাক্ত করা হয়। হত্যা মামলায় ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২৩টি ধারায় ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে এবং বিস্ফোরক আইনের দুটি ধারায় ৮০৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পিলখানা বিদ্রোহে হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগকারী ও বিস্ফোরক মামলায় আসামিদের বিচার কোনো আইনে হবে সেটি নির্ধারণ করা হয়েছে সুপ্রিমকোর্টের মতামত অনুসারে। সিআইডির তদন্তে এ ঘটনার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা ষড়যন্ত্র পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সিআইডির চাজর্শিট মোতাবেক পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিডিআর মহাপরিচালকসহ ৫৭ অফিসারকে হত্যা করা হয়।

 






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Shares