Main Menu

নোয়াখালীতে গান্ধী:ছাগল চুরির আড়ালে এক রক্তাক্ত ইতিহাস

+100%-

ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারত স্বাধীন হওয়ার এক বছর আগে, ১৯৪৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে নোয়াখালীতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়, যা নোয়াখালী দাঙ্গা নামেও পরিচিত। এই দাঙ্গার ঘটনাটি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের এক মর্মান্তিক এক অধ্যায়।

এই ঘটনার পর ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী ওই অঞ্চলে গিয়ে প্রায় তিন মাস কাটান। পুরো অঞ্চলটি বেশিরভাগ পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান তিনি। হিন্দু-মুসলমান সমাজের নানা অংশের সাথে কথা বলেন এবং বিভিন্ন জনসভায় গিয়ে ভাষণ দেন। এই হানাহানি বন্ধ করে দুর্বলকে রক্ষা করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।

নোয়াখালীতে সফরকালে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটে। তিনি ছাগলের দুধ খেতেন। এ কারণে সাথে করে ছাগন এনছিলেন। কিন্তু নোয়াখালীতে আসার পর তার একটি ছাগল চুরি যায়। ফলে, এই চুরির ঘটনার জন্য দায়ী করে নোয়াখালীবাসীকে আজও হেয় করার প্রচেষ্টা দেখা যায়। তবে ছাগল চুরির মতো সামান্য ঘটনার আড়ালে এক রক্তাক্ত ইতিহাস লুকিয়ে আছে।

ব্রিটিশ শাসন অবসানের এক বছর আগে থেকেই অবিভক্ত বাংলা প্রদেশ ছিল অগ্নিগর্ভ। হিন্দু ও মুসলমান সমাজের পারষ্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ঘৃণা এমন এক অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার জেরে ১৯৪৬ সালের ১৬ই অগাস্ট ঘটে যায় পূর্ব ভারতের ইতিহাসের কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ বা কলকাতা দাঙ্গা।

এই দাঙ্গা শুরুর প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হিন্দু-মুসলিমসহ চার হাজার মানুষ প্রাণ হারান এবং গৃহহীন হন এক লাখেরও বেশি মানুষ। দাঙ্গার কিছু বিলম্বিত প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন নোয়াখালীতে শুরু হয় আরেকটি হত্যাযজ্ঞ। স্থানীয়দের দ্বারা ধারাবাহিক গণহত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, হিন্দুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে থাকে। কলকাতা দাঙ্গার রেশ ধরে এই ভয়াবহ দাঙ্গা ঘটে। যদিও এর পূর্ববর্তী কলকাতা দাঙ্গা ও পরবর্তী বিহার দাঙ্গার থেকে হতাহত সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম।

১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর। কোজাগরি লক্ষ্মীপূজার দিন। উত্তপ্ত সাম্প্রদায়িক আবহাওয়ার মধ্যে হঠাৎ করেই একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। গুজবটি ছিল- লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থানার করপাড়ার জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর বাড়িতে ভারত সেবাশ্রম সংঘের এক সন্ন্যাসী এসে উঠেছেন। তার নাম সাধু ত্রিয়াম্বাকানন্দ। তিনি নাকি ঘোষণা করেছেন, পূজার জন্য ছাগবলির বদলে এবার তিনি মুসলমানের রক্ত দিয়ে দেবীকে প্রসন্ন করবেন।

স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে এই গুজব। করপাড়া থেকে সামান্য দূরে শ্যামপুর দায়রা শরীফ। গোলাম সারোয়ার হুসেইনী এই পীর বংশের উত্তর পুরুষ। গুজব পত্রপল্লবে ছড়িয়ে পড়ার পর ১০ই অক্টোবর ভোরে চৌকিদারের মারফৎ রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর কাছ থেকে একটি চিঠি পাঠান এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন তিনি।

কিন্তু রাজেন্দ্রলাল চৌধুরী এতে সাড়া না দিলে গোলাম সারোয়ার হুসেইনী সকালে শাহ্পুর বাজারে তার অনুগত ভক্ত এবং মুসলমানদের এক সমাবেশ ডাকেন। সেখানে মুসলমানদের সেই সময়কার অবস্থান তুলে ধরেন এবং হিন্দু জমিদারকে উৎখাত করার ডাক দেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সমাবেশ থেকে তিনি জমিদার ও সাধুর কল্লা কেটে আনার নির্দেশ দেন। এরপরই সহিংসতার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। শাহ্পুর বাজারের সব হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকানপাট লুট করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। রামগঞ্জ এবং দশঘরিয়া বাজার লুট হয়। নারায়ণপুরের জমিদার সুরেন বোসের কাছারি বাড়িতে হামলা হয়।

এ ঘটনার পরদিন ১১ই অক্টোবর সকালে হামলা হয় করপাড়ার চৌধুরী বাড়িতে। পরিবারটি প্রথম দিকে বন্দুক ব্যবহার করে হামলাকারীদের ঠেকিয়ে রাখলেও এক সময় তাদের গুলি ফুরিয়ে যায়। উত্তেজিত জনতা এসে রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর মাথা কেটে ফেলে। সাধু ত্রিয়াম্বাকানন্দ এর আগেই কোনো মতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান।

রায়পুরের জমিদার চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরী নোয়াখালীতে মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তিকে গোড়া থেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। এবার এ ঘটনার পর এ নিয়ে তার সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর।

চিত্তরঞ্জন রায় কংগ্রেসের সাথে যুক্ত ছিলেন বলে হুসেইনী কংগ্রেসের বিভিন্ন নেতা এমনকি মহাত্মা গান্ধীর কাছেও চিঠি পাঠিয়ে জমিদারের অত্যাচারের কথা জানান। সেই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাতে কোনো সাড়া না পেয়ে নিজেই চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের ডাক দেন তিনি।

আধাসামরিক বাহিনী ‘মিয়ার ফৌজ’ এবং এক সহযোগীর অধীন ‘কাশেম ফৌজ‘র সদস্যরা রায়পুরের জমিদার বাড়ি অবরোধ করে। এ নিয়ে সংঘর্ষ শুরু হয়, যার পরিণামে রায় চৌধুরী তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করেন।

এসব ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়লে নোয়াখালী জেলার রায়পুর, রামগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ছাগলনাইয়া এবং পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা (বৃহত্তর কুমিল্লা) জেলার চাঁদপুর, চৌদ্দগ্রাম, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ এবং লাকসাম থানার বিশাল এলাকাজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে এই দাঙ্গা অব্যাহত ছিল। এতে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি হিন্দু প্রাণ হারান।

মূলত তিনটি কারণে নোয়াখালীর হত্যাযজ্ঞকে ভারতের অন্যান্য জায়গার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সাথে তুলনা করতে চান না ইতিহাসবিদরা।

প্রথমত, এখানে দুই পক্ষের শক্তি সমান ছিল না, যেমনটি দেখা গিয়েছিল কলকাতা দাঙ্গার সময়। এখানে মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠী হামলার শিকার হন। দ্বিতীয়ত, ওই হত্যাযজ্ঞের সময় এবং পরে বহু হিন্দু নারীকে ধর্ষণ করা হয়। তৃতীয়ত, হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষদের জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। যাদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল তাদের কাছ থেকে লিখিয়ে নেয়া হয়েছিল যে তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

তবে যাকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটছিল সেই গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর একটি রাজনৈতিক পরিচয়ও ছিল। গদ্দিনশীন পীর ছাড়াও তিনি ছিলেন নোয়াখালী কৃষক সমিতির অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা। কৃষকের খাজনা মওকুফ, ঋণ সালিশি বোর্ড থেকে সুদখোর ব্যবসায়ীদের উৎখাত করা এবং জমিদারি বাজার বয়কট করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তৎকালীন নোয়াখালীর ক্ষমতাধর হিন্দু জমিদার এবং মহাজনদের চক্ষুশূল হয়েছিলেন তিনি।

হুসেইনী ১৯৩৭ সালে রামপুর ও রায়গঞ্জ নির্বাচনী এলাকার কৃষক প্রজা পার্টির টিকেটে নির্বাচন করেন। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ১২ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন এবং বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে অবশ্য ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন তিনি। কিন্তু তার কৃষকপন্থী নীতির কারণে তিনি কখনই নোয়াখালীর ‘হিন্দু ভদ্রলোকদের’ কাছের মানুষ হতে পারেননি। যার পরিণতিতে তার ব্যাপারে প্রথমদিকে আগ্রহী হলেও পরে আর তাকে দলে টানতে পারেনি কংগ্রেস।

নোয়াখালী দাঙ্গার চার সপ্তাহের মধ্যে হাজার হাজার হিন্দু ঘরবাড়ি হারিয়ে কুমিল্লা, চাঁদপুর, আগরতলা ও অন্যান্য জায়গার অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। এই পটভূমিতে নোয়াখালীতে আসার সিদ্ধান্ত নেন মহাত্মা গান্ধী।

গবেষকরা বলছেন, নোয়াখালীতে গিয়ে কী করতে চান কিংবা কী হবে তার কৌশল, যাত্রার আগে, এমনকি যাত্রার সময়ও, সে সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন গান্ধী। তিনি শুধু এটুকু বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার সেখানে যাওয়া দরকার। পরিস্থিতির জটিলতা অনুধাবন করে তার সফরের এক পর্যায়ে তিনি তার সেক্রেটারি নির্মল কুমার বোসকে বলেছিলেন, তাকে হয়তো নোয়াখালীতে বহু বছর থাকতে হবে।

ওই বছরের ৬ই নভেম্বর নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন মহাত্মা গান্ধী। পরদিন চৌমুহনীতে যোগেন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে দুই রাত কাটিয়ে ৯ই নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি তার শান্তির লক্ষ্যে পদযাত্রা শুরু করেন।

এর পরের দিনগুলোতে খালি পায়ে মোট ১১৬ মাইল হেঁটে প্রায় ৪৭টি দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় তিনি নিয়মিত প্রার্থনা সভা পরিচালনা ছাড়াও স্থানীয় মুসলমানদের সাথে বৈঠক করে হিন্দুদের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন।

নোয়াখালীতে এসে গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর সাথেও দেখা করতে চান গান্ধী। হুসেইনী ততদিনে গান্ধীর ওপর সম্পূর্ণভাবে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাই তিনি প্রথম দিকে সাক্ষাতে রাজি ছিলেন না। পরে গান্ধীর আহ্বানে চাটখিলে দুজনের বৈঠক হয়।

বৈঠকে তিনি গান্ধীকে বলেন, দাঙ্গার সূত্রপাত নোয়াখালীতে নয়। কলকাতা ও বিহারে যখন দাঙ্গা থেমে যাবে তখন নোয়াখালীতেও হানাহানি বন্ধ হবে।

ছাগলের দুধ পান করতেন মহাত্মা গান্ধী। তাই সাথে করে একটি ছাগল এনেছিলেন। কিন্তু চাটখিলের বৈঠকের আগে কাশেম ফৌজের লোকজন ছাগলটি চুরি করে। চাটখিলে ওই বৈঠকে সেই ছাগলের রান্না মাংস নিরামিষাশী গান্ধীর সামনে পরিবেশন করা হয়। যার মাধ্যমে হুসেইনী একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তবে নোয়াখালীতে হিন্দু-মুসলিমে সম্পর্কের মধ্যে যে পারষ্পরিক ঘৃণা ও অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছিল, গান্ধীর মতো ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও তা ভেঙে ফেলতে ব্যর্থ হন বলেই গবেষকরা বলছেন। নোয়াখালীর ঘটনার জেরে শুরু হয় আরেক দাঙ্গা।

এ পরিস্থিতির মধ্যে বিহারে দাঙ্গা বাধে। এতে প্রচুর মুসলমান প্রাণ হারাতে শুরু করলে গান্ধীকে বিহারে যেতে অনুরোধ করেন মুসলিম লীগ নেতারা। নোয়াখালী শান্তি মিশন অসমাপ্ত রেখেই ১৯৪৭ সালের ২রা মার্চ বিহারের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। নোয়াখালী সফরের এক মাস পর যখন তাকে জানানো হয়, সেখানে তখনও সহিংসতা চলছে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Shares