Main Menu

সোলাকিয়া ও গুলশান হামলায় প্রমাণিত আমাদের পুলিশ এখন অনেক পেশাদার

+100%-

police-newsমাহবুবুল আলম //: আমরা যে যখন যেভাবে পারি আমাদের পুলিশকে গালমন্দ করি, তাদের নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলি সুযোগ পেলেই তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করি। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী পরিচালিত ইতিহাসের কলঙ্কজনক ‘অপারেশন সার্চলাইটেও’ প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে সামিল হয়েছিল রাজারবাগের পুলিশ ব্যারাকের পুলিশ বাহিনী এবং সারাদেশের থানাগুলো বিদ্রোহ করেছিল পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে। পুলিশ বাহিনীর সেই সাহসে বলিয়ান হয়েই পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে অসম মুক্তিযুদ্ধে সামিল হায়েছিল দেশের মানুষ। তারপর সর্বহারা সন্ত্রাসী, ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি জামায়াতের শাসনামলে জঙ্গি উত্থানের প্রতিকূল সময়ও আমাদের পুলিশবাহিনী তা প্রতিরোধ করে দিতে সক্ষম হয়।
আমরা যখন তখন জঙ্গি-বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীদের মতো বলি পুলিশ দুর্নীতিবাজ, পুলিশ এই, পুলিশ সেই। তাহলেতো পুলিশের প্রতি সুবিচার করা হলোনা। বিএনপি-জামায়াত জঙ্গিদের সেটা বলার কারণও আছে, কেননা, বাংলাদেশে গতবছর বিএনপি-জামায়াত-শিবির ও জঙ্গিদের অবরোধের নামে টানা ৯৩ দিনের যে, জ্বালাও পোড়াও, পেট্টোলবোমার অগ্নিসন্ত্রাস ১২০ জনের মতো মানুষকে জ্যন্ত পুড়িয়ে মারার যে নৃশংস খেলায় মেতে ওঠেছিল তা কিন্তু কয়েকজন সহকর্মীর জীবনের বিনিময়ে পুলিশই রুখে দিয়েছিল। পুলিশের তৎপরতার জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। তাই পুলিশের ওপর তাদের এত আক্রোশ। আর ১লা জুলাই গুলশানের হলি অর্টিজান হোটেলে প্রায় পঞ্চাশজন নিরপরাধ দেশি-বিদেশীকে জিম্মি করে বাংলাদেশী তিনজনসহ যে ২৮ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়া হলো তার প্রথম প্রতিরোধেই কিন্তু জীবনবাজী রেখে এগিয়ে এসেছিল আমাদের পুলিশ ভাইয়েরা।
আমরা সকলেই ইতমধ্যে জেনে গেছে যে, জানি১ জুলাই যখন গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা ঢুকে পড়েছে বলে খবর আসে তখন একযোগে পাঁচ থানার ওসির কাছে খবরটি পৌঁছানো হয়। ওয়্যারলেস সেটে ওসিরা একে অপরকে দোস্ত সম্বোধন করে ঘটনাস্থলে রওনা দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে নিজেরাও রওনা দেন। জীবনে বহুবার অসীম সাহসিকতা দেখিয়ে পুরস্কৃত বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছেন এবং পরক্ষণেই আরেক দুর্ধর্ষ ডিবি অফিসার রবিউল তার সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়ে জঙ্গীদের তোপের মুখে পড়েন। দুই পুলিশ কর্মকর্তা ও তাদের দল মনে করেছে, রমজান মাসের সাধারণ ডাকাত দল হয়ত হামলা করেছে এবং পুলিশ ও ডিবি দেখলেই তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নিবৃত্ত হয়ে যাবে, যা সাধারণত অন্যান্য ক্ষেত্রে অহরহ ঘটছে। দুই পুলিশ কমকর্তা এতটুক আঁচ করতে বা বুঝতেই পারেননি যে, জঙ্গীরা বিভিন্ন দেশে যে কায়দায় হোটেল-রেস্তরাঁয় জিম্মি ও হামলা করে সহিংস সন্ত্রাসের মাধ্যমে রক্তাক্ত ঘটনা উপহার দিয়ে যাচ্ছে, তারই ধারাবাহিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতেও। তাই সেদিন রাতে এসি রবিউল ও ওসি সালাউদ্দিন, দুই পুলিশ কর্মকর্তা তাদের দল নিয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির সামনে যেতেই এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ ও গ্রেনেড-বোমা ছুড়তে থাকে জঙ্গীরা। জঙ্গীদের গ্রেনেড-বোমার স্প্রিন্টারের আঘাতেই প্রথমেই গুরুতর আহত ও পরে নিহত হন ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম, বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন।
সেই দিনের সেই ভয়াবহ ও নৃশংস ঘটনায় আহত গুলশান থানার পুলিশের এসআই ফারুক হোসেন গণমাধ্যমের সাথে যে সাক্ষাতকার দেন তা আমাদের পুলিশের পেশাদারীত্বের নিদর্শণ হিসেবে এখানে তুলে ধরা হলো। এবং তা তোলে ধরা হলো এসআই ফারুক সাহেবের জবানীতেই ‘শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার পর গুলশান থানার একটি টহল টিম দায়িত্ব পালন করছিল গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনের পাশে। হঠাৎ গুলশান থানার ওসি ওয়াকিটকিতে বার্তা পাঠান লেকভিউ ক্লিনিক আক্রান্ত হয়েছে। এই বার্তা পাওয়ার পর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছয় সদস্যের টহল টিম নিয়ে সেখানে পৌঁছে যান তিনি। সেখানে গিয়ে দেখেন, মূল গেটের ভেতরে একজন আহত হয়ে পড়ে আছেন। তিনি জানালেন, ভেতরে অনেককে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় রেস্তোরাঁর বাইরে দাঁড়িয়েছিল একটি প্রাডো গাড়ি। পুলিশের টহল গাড়ি দেখার পরপর সেটা দ্রুত পালিয়ে গেল। হোটেলের ভেতর থেকে কয়েকজন দুর্বৃত্তও পালানোর চেষ্টা করছিল। গাড়িটি সম্ভবত তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। জঙ্গিদের লক্ষ্য করে গুলি শুরু হলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। গ্রেনেডের আঘাতে প্রথমে দু’জন কনস্টেবল আহত হন। তারপরও তাদের লক্ষ্য করে আমরা গুলি ছুড়তে থাকি। তখন তারা রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। এ সময়ে ওয়াকিটকিতে আক্রান্ত হওয়ার খবর দিই। সবাইকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট নিয়ে আসতে বলি। জঙ্গিদের অন্তত পাঁচ সদস্যকে দেখেছি আমি। দু’জনের কাছে ব্যাগ ছিল। সবার কাছেই ছিল অস্ত্র। পুলিশের পরবর্তী টিম আসার আগ পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে আমরা কিছু কৌশল নিয়েছি। আমাদের আগে ঘটনাস্থলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো দল পৌঁছেনি। দু’জন কনস্টেবল আহত হওয়ার পর তাদের কাছে থাকা শটগান নিয়ে কিছুক্ষণ পরপরই গুলি করতে থাকি। যদিও আমার কাছে পিস্তল ছিল। শটগানের গুলি ছুড়লে বিকট শব্দ হয়। তাই বন্দুকধারীদের আতঙ্কিত করতে শটগানের গুলি ছুড়ি। যাতে তাড়াতাড়ি গুলি শেষ হয়ে না যায় তাই কিছু সময় পরপর থেমে থেমে গুলি করেছি। পুলিশের অন্য টিম আসার পর ফারুকসহ আহত অন্যদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গির হামলার পর পালিয়ে যেতে চেয়ে ছিল। সেই সময় তাদের জন্য রেস্তোরাঁর বাইরে দাঁড়িয়েছিল একটি প্রাডো গাড়ি। পুলিশের টহল গাড়ি দেখার পরপর সেটা দ্রুত পালিয়ে গেল।
তার এ বক্তব্য ও সেদিনের পারিপাশ্বিক অবস্থা দেখে এটা মনে হওয়ার যথেষ্ঠ কারণ আছে যে, একদিকে শুক্রবার অন্যদিকে ঈদের ছুটি তারওপর তারাবীহ নামাজের কারণে রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকবে তাই অপারেশন করে পালিয়ে যাওয়া সহজ হবে। সেই কারণে জঙ্গিরা এ মোক্ষম সময়টাকেই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু জঙ্গিদের এই সহজ ভাবনাকেই কঠিন করে তুলেছে পেশাদার হয়ে ওঠা আমাদের পুলিশবাহিনীর বীর সদস্যরা।
এইতো গেল গুলশান অভিযানের কথা। আর গতকাল পবিত্র ঈদের দিনে দেশের সর্ববৃহত সোলাকিয়া ঈদের জামায়াতের কাছাকাছি যে ঘৃণ্যতর জঙ্গি হামলা চালালো পুলিশ সদস্যরা যদি তাদের সহকর্মীদের জীবনের বিনিময়ে রুখে দিতে না পারতো, তা হলে যে কত বড় হত্যাকান্ডটি সংঘটিত হতো তা ভাবতেই গা শিহরে ওঠে। ভয়াবহ ম্যাসাকারের পরিকল্পনা নিয়েই এ হামলার পরিকল্পনা করেছিল জঙ্গিগোষ্ঠী। কিন্তু ধীরে ধীরে পেশাদার হয়ে ওঠা আমাদের পুলিশ বাহিনীর বীর সদস্যরা নিজেদের জীবন দিয়ে আবারও তাদের পেশাদারীত্বের প্রমাণ দিয়ে গেল। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই সাম্প্রতিক সময়ে পর পর দুইটি পরিকল্পিত জঙ্গি হামলায় আত্মোৎসর্গকারী পুলিশের বীর সদস্যদের।
পরিশেষে বলতে চাই, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঝড়ঝ্ঞ্ঝা মাথায় নিয়ে, পরিবার পরিজনের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত আমাদের পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে সব ধরনের নেতিবাচক কথা বলা, ও প্রচারনা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের সকলের উচিৎ তাদের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের দেশে পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে যত নেতিবাচক প্রচারনা চালানো হয় আর কোথাও তা হয়না। এতে পুলিশ বাহিনীর ওপর মনোস্তাত্বিক চাপ বাড়ে এবং হতাশায় নিমজ্জিত হয়। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের দেশে সীমিত সুযোগ সুবিধা ভোগ করে পুলিশ যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, পৃথিবীর অন্য কোন দেশে তা সম্ভব নয়। আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনী যদি দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ না হয়ে দেশের কঠিন সময়গুলোতে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না রাখতেতো তাহলে কবেই পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশও একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত হতো।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Shares