Main Menu

ভারতে চিকিৎসা অভিজ্ঞতাঃ দিল্লীর ফর্টিস এসকর্ট হসপিটালে বাইপাস অপারেশন

+100%-

Fortis-Escorts-Heart-Institute-and-Research-Centre-New-Delhiমোঃ জাহিদ হোসেন :: গত মাসে ভারতের রাজধানী দিল্লীর ফর্টিস এসকর্ট হার্ট ইনস্টিটিউট (ওখ্‌লা, নিউ দিল্লী) এ গিয়েছিলাম বাবার হৃদরোগের অপারেশন করাতে। ইংরেজীতে বেশ কিছু তথ্যমূলক ওয়েবসাইটে থাকলেও বাংলাতে মাত্র কয়েকটি ব্লগ ও নোট পেয়েছিলাম। তাই ভাবলাম নিজের অভিজ্ঞতাই শেয়ার করি। আশা করি অনেকের উপকারে আসবে। (দুঃখপ্রকাশ- লেখাটি বেশ বড় হয়ে গেলো)।

পূর্বকথাঃ

আমার বাবার (বয়স ৬০ বছর) গত ১ বছর ধরেই বুকে ব্যাথা ছিলো। তিনি একজন আদর্শ চেইন স্মোকার। গত এপ্রিল,২০১৬ তে শাহবাগের ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল এ এনজিওগ্রাম করানো হয়। সেখানে পরীক্ষায় চারটি ব্লক ধরা পড়ে। আমরা ভেবেছিলাম ২/১ টা ব্লক হয়ত থাকবে, রিং পড়ালেই হয়ে যাবে। কিন্তু চারটি ব্লক (১০০%, ৯৫%, ৮০%, ৮০%) থাকাতে ডাক্তার সাজেশন দিলেন সি.এ.বি.জি করাতে (করোনারী আর্টারী বাইপাস গ্রাফট্ / যা আমরা বাইপাস অপারেশন হিসেবে জানি)। অতঃপর বাইপাস করানোর কথা শুনে আমরা বাসায় চলে আসি। বিভিন্ন অভিজ্ঞজনের সাথে কথা বলি। সবার বিভিন্ন উপদেশ গোগ্রাসে গেলা শুরু করি। আমাদের দেশে সচরাচর যা হয় আর কি – আমরা সবাই তো কমবেশী ডাক্তার, বিভিন্ন রকম উপদেশ -এই হসপিটাল (সরকারী/ প্রাইভেট) ভালো, এই ডাক্তার ভালো, আরে ধুর ওই হসপিটাল/ ডাক্তার তো কসাই, আরে এইটা কোন রোগই না- ন্যাচারাল চিকিৎসা নাও, মেডিটেশনই যথেষ্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনকি একই ডাক্তারের কাছে বাইপাস করানো দুই রোগীর ফিডব্যাক দুই রকম (একজন মহাতৃপ্ত/ আর একজনের অভিযোগের অন্ত নেই)।

[টিপসঃ বুকে/ হার্টে ক্রমাগত ব্যাথা অনুভব হলে এনজিওগ্রাম করে ফেলা উচিত। অন্যথায় হার্ট এট্যাক হয়ে যদি হার্টের কোন অংশ ড্যামেজ হয়ে যায় পরবর্তীতে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা অত্যন্ত জটিল। বিঃদ্রঃ- এনজিওগ্রাম/ পিসিআই কোন চিকিৎসা নয়। ইহা ডায়গনোসিস মাত্র। এর দ্বারা হার্টের আর্টারীগুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কেউ ডাক্তার থাকলে তিনি বিশদ ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। এছাড়া জানতে চাইলে ইউটিউব/ গুগল করুন। প্রচুর ভিডিও এবং লেখা পাবেন হার্ট, করোনারী এনজিওগ্রাম ইত্যাদি বিষয়ে।]

হাসপাতাল সার্চঃ

দেশে বাইপাস করায় এমন ২টি হাসপাতালে খবর [ইব্রাহিম কার্ডয়াক হসপিটাল – ২ লাখ ৩০ হাজার (ওয়ার্ড), ৩ লাখ ৮০ হাজার (সিংগেল কেবিন)]; [ইউনাইটেড হসপিটাল – ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা(ওয়ার্ড)/৪ লাখ (সিংগেল কেবিন)] নিলাম। এছাড়াও এপোলো, ল্যাব এইড, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এমনকি প্রত্যন্ত দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনেও সফলতার সাথে বাইপাস হয় বলে জেনেছি (এদের খরচ জানা হয়নি, সরকারীগুলোতে খরচ কম হবার কথা)।

যাই হোক, আমি দেশের খবর নেবার সাথে সাথে বিদেশের খবরও নেবার চেষ্টা করলাম [https://www.health-tourism.com/] । আশেপাশের দেশসমূহের মধ্যে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ (২৭০০০ ডলার = ২১ লাখ টাকা), থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাডে Bumrungrad International Hospital (২১ লাখ টাকা) শুধুমাত্র বাইপাস অপারেশন করাতে খরচ পড়ে। অতঃপর ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালের খোজ নিলাম। ভারতের বিভিন্ন বিখ্যাত হাসপাতালে বাইপাস এর খরচ (আধুনিক ভাষায় ট্রিটম্যান্ট প্লান) জানতে চেয়ে এনজিওগ্রাম রিপোর্ট এটাচ করে ওয়েবসাইটের দেয়া মেইল এড্রেস (ইন্ট্যারন্যাশনাল রোগীদের জন্য আলাদা মেইল এড্রেস দেয়া থাকে) এ সরাসরি মেইল করলাম। প্রত্যেকটি হসপিটাল আমার মেইল এর উত্তর ব্যাক করে !!!! তন্মধ্যে কয়েকটি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। এপোলো চেন্নাই (৬৫০০ ডলার),ফর্টিস এসকর্ট দিল্লী (৬০০০ ডলার), ফর্টিস মেমোরিয়াল গুরগাও (৬২০০ ডলার), নারায়না হৃদয়ালয়া ব্যাঙ্গালোর (৫০০০ ডলার), এটার্নাল হার্ট ইনস্টিটিউট জয়পুর (৫৭০০ ডলার) ইত্যাদি। এছাড়াও আরও বিভিন্ন বিখ্যাত হাসাপাতাল আছে (সিএমসি ভ্যালোর, বিড়লা হার্ট কলকাতা, মেদান্তা গুরগাও, এপোলো দিল্লী, এশিয়ান ইন্সটিটিউট মুম্বাই ইত্যাদি)।
এখানে উল্লেখ্য দেশে কিংবা বিদেশে সব হাসপাতালের বাইপাস অপারেশন এর প্যাকেজ কম বেশী একই (৭ -৯ দিন হাসপাতালে অবস্থান, রোগীর সাথে সার্বক্ষনিক একজন সহযোগীর থাকার সুযোগ খাওয়াসহ, টুইন শেয়ারিং রুম – মানে একরুমে দুই রোগী ইত্যাদি)। এছাড়াও প্রাইভেট রুম (মানে সিংগেল কেবিন রুম) আছে, সেক্ষত্রে উল্লেখিত মোট অংকের চেয়ে হাসপাতালভেদে প্রায় ১০০০-২০০০ ডলার বেশী পড়ে।

[টিপস- প্রথমে আপনি ১০-১২টা হাসপাতাল সিলেক্ট করে ওদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে মেইল এড্রেস সংগ্রহ করবেন। অতঃপর আপনি আপনার সমস্যা বিস্তারিত বর্ণনা করে একটি মেইল লিখবেন। মেইলে রোগীর যাবতীয় রিপোর্ট এটাচ করে ওদের কাছে সম্ভাব্য ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান/ Treatment Plan জানতে চেয়ে বিভিন্ন হসপিটালে মেইল করবেন। পরে হসপিটাল কর্তৃপক্ষ ২/৩ দিনের মধ্যে Treatment Plan সহ মেইল ব্যাক করবে। একটি Treatment Plan এ পুরো প্যাকেজ (খরচ, দিন সংখ্যা) উল্লেখ থাকে। নীচে হসপিটাল থেকে পাঠানো একটা প্ল্যান এর সেম্পল দেয়া হলো। ]

Please find the treatment as advised by the doctor. The treatment is being offered at our flagship facility

Diagnosis /Treatment Required: Treatment Plan: Evaluation followed by CABG. Treatment by

Doctor/Team: Dr. S A

Cost of CABG – will be approx. USD 5600 in ward// Cost will be approx. USD 6200 in Twin Sharing// Cost will be approx. USD 7200 in Single room

Stay in Hospital – 8 days
Stay in India- 15-20 days

For IPD patients, the estimated package includes- Room tariff (for the specified period) / Surgeon’s fees/O.T. charges /Anesthesia charges /Investigations related to the surgery /Food and Beverage for the patient and 1 companion during stay

Our End-to-End Facilities for You-International Concierge Desk will help to arrange for a hotel/ guest house as per your preference / Complimentary two way airport transfers /Complimentary in-room stay and meals for one companion during hospital treatment / In case of ICU admission, stay for one companion would be arranged in ICU Lounge / Payments can be done either via cash, credit card or Wire Transfer/ International Concierge Desk available at the hospital will facilitate travel within the city as well as for local sight-seeing

Exclusions- All expenses for stay beyond the package period/ Additional charges in case of inter-disciplinary consultations/Additional procedure costs / Use of special drugs/ consumables/ blood components /(Specific to the treatment)

হসপিটাল নির্বাচনঃ

আমরা সিদ্ধান্ত নেই দিল্লীর ফর্টিস এসকর্ট হার্ট ইন্সটিটিউট (৬০০০ ডলার/ ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা) এ বাইপাস করাবো। এই হাসপাতাল সিলেক্ট করার এবং অন্যগুলো সিলেক্ট না করার পেছনে তেমন কোন শক্তিশালী কোন যুক্তি নেই (যেহেতু কোন ডাক্তার অথবা পূর্বে সেবাপ্রাপ্ত রোগী কারও সাথেই আমার কোনরূপ পূর্ব যোগাযোগ ছিলো না)। তবুও ওয়েবসাইটের র‍্যাংকিং, অভিজ্ঞ পুরানো হাসপাতাল, বিভিন্ন ইংরেজী রিভিউ (যদিও বেশীরভাগই হাসাপাতাল রিভিউ আমার কাছে কেনজানি পেইড রিভিউ মনে হয় !!!), ভাষা সুবিধা ( হিন্দি, যেহেতু সিরিয়াল সবাই কমবেশী দেখি), রাজধানী শহর (হাজার হোক সরকারী আমলারা তো করায়)ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে এই হাসপাতাল সিলেক্ট করি।

মেডিকেল ভিসা প্রাপ্তিঃ

ভারতে চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ভিসা নিতে হয়। মেডিকেল ভিসা নিতে বাংলাদেশের ডাক্তারের রিকমেন্ডেশন এবং যেই হসপিটাল/ ডাক্তারের কাছে যাবেন তাদের ইনভাইটেশন লাগে। হসপিটাল সিলেক্ট করার পর কর্তৃপক্ষকে আসার তারিখ মেইলে জানিয়ে দেবার পর তারা নিজেরাই ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আমাকে মেইল করে, যা ভিসার কাগজপত্রের সাথে জমা দেই।

[ টিপসঃ মেডিকেল ভিসার জন্য আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের অথবা ডাক্তারের এপয়ন্টমেন্ট লেটার সংগ্রহ করুন। এটা কোন কঠিন ব্যাপার নয় – আপনি বিভিন্ন হাসপাতালের ট্রিটম্যান্ট প্লান জোগাড় করে আপনার সুবিধামতো হাসপাতাল নির্বাচন করুন, ওদেরকে আপনার ডকুমেন্টস মেইল করুন এবং এপয়েন্টেমন্ট চান, ওরা নিজেরাই এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আপনাকে পাঠিয়ে দিবে ।
মেডিকেল ভিসার সাথে ২ জন পর্যন্ত এটেনডেন্ট ভিসা দিয়ে থাকে (মানে রোগীর সাথে সর্বোচ্চ দুই জন যেতে পারবেন)। ওয়েবসাইটে ফর্ম পূরণ করে, সব কাগজপত্র জোগাড় করে চলে যান গুলশান ইন্ডিয়ান এম্বেসিতে। সময় ৯-১০টা (ভোরে যাবার কোন প্রয়োজন নেই)। মেডিকেল ভিসার জন্য কোন ই-টোকেন লাগেনা। মেডিকেল ভিসার লাইনে দাড়ানো প্রত্যেকের আবেদনপত্র এম্বেসী জমা নেয়। সব কাগজপত্র ঠিকমত থাকলেও মেডিকেল ভিসা হয়নি এমনটি আমার জানা নেই।
উল্লেখ্য বেসরকারী চাকুরীজীবীদের জন্য অফিসের এন.ও.সি লাগবে। অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীদের জন্য কোন ভিসা লাগে না – জি.ও. থাকাই যথেষ্ট। ব্যবসায়ী/ অন্যান্যদেরটা আমার জানা নেই। যে কোন ধরনের কোয়েরী থাকলে ইন্ডিয়ান এম্বেসীর হেল্প লাইনে (Hot Line: 09612 333 666, 09614 333 666) ফোন দিতে পারেন। আমি বেশ কয়েকবার দিয়েছিলাম। উনাদের যথেষ্ট হেল্পফুল মনে হয়েছে। ]

দিল্লী যাত্রাঃ

আমরা এয়ার রুটে দিল্লী গিয়েছিলাম। ঢাকা-দিল্লী সরাসরি ফ্লাইট আছে জেট এয়ারের ( প্রতিজন ২৪০০০ রূপী)। এছাড়া কলকাতা হয়ে গেলে খরচ অনেক কম পড়ে। ঢাকা-কলকাতা এরপর কলকাতা-দিল্লী এভাবে গেলে বেশ বড় একটা খরচ বাঁচে (তখন প্রতিজন ৮৫০০-১০০০০ রূপী) । কলকাতা হয়ে গেলে মাঝখানে কয়েকঘন্টা কলকাতা এয়ারপোর্ট এ পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
[টিপস – যদি সম্ভব হয় – টিকেট ১৫/২০ দিন আগেই কেটে ফেলুন (খরচ অনেক কম পড়বে) এবং এমন তারিখে যাত্রা ঠিক করুন যেনো ট্রানজিট সময় অনেক কম (২-৩ ঘন্টা) হয়। এছাড়াও বাসে, ট্রেনেও দিল্লী যাওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে খরচ কমে যায়। যেমন বাসে/ ট্রেনে ঢাকা – কালকাতা, এরপর ট্রেনে কলকাতা – দিল্লী। বাংলাদেশে এখন অসংখ্য ট্রাভেল এজেন্সী আছে। এদের সাথে যোগাযোগ করলে আরও আপডেট ধারনা পাবেন।]
আমি অবশ্য পুরো ট্রাভেল প্ল্যানটাই (আসা যাওয়া টাইমিং) নিজে করেছি। https://www.makemytrip.com/ এই ওয়েবসাইট দেখে। পরে ট্রাভেল এজেন্সীকে দিয়ে শুধুমাত্র টিকেট কনফার্ম করেছিলাম। এইটাই বেস্ট মনে হয়েছে আমার কাছে।

[টিপসঃ এমনভাবে প্ল্যান করুন যেনো দিল্লীতে সকাল/দুপুরের মধ্যে পৌছান। অফিস আওয়ারে পৌছাতে পারলে একটু লাভ আছে। যেমন – আপনি রোগী ভর্তি করিয়ে একটু আশেপাশে ঘুরে খাওয়ার দোকান, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দোকান অথবা হোটেল খুজতে সহজ হবে ]

হাসপাতালে পৌছানোঃ

আগেই এপয়েন্টমেন্ট থাকায় আমি সেভাবেইযাত্রার সময় ঠিক করি এবং প্লেনের টিকেট হাসপাতালের ইন্ট্যারন্যাশনাল ডেস্ক (যার সাথে যোগযোগ করছিলাম)এ মেইল করি। তারা এয়ারপোর্ট এ হাসপাতালের গাড়ী এবং ড্রাইভার পাঠিয়ে দেয়। ড্রাইভার এয়ারপোর্টের গেটে রোগী ও হাসপাতালের নামের প্ল্যাকার্ডনিয়ে দাড়িয়ে থাকে। পরিচয় দিলে ড্রাইভার সরাসরি আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসে।
[টিপস- এছাড়াও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি কাউকে নাও পাঠাতো বা ড্রাইভার আসতে দেরী করে – এতে ঘাবড়াবার কিছু নেই। ট্যাক্সি অথবা অটো নিয়ে সরাসরি চলে যান আপনার হাসপাতালের ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে।ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক পর্যন্ত আসতে পারাই আপনার একমাত্র কাজ। একবার এ পর্যন্ত আসতে পারলে আপনি নিশ্চিন্ত। এদের পেশাদারিত্ব দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না (আমরা যারা বাংলাদেশে সরকারী হাসপাতালের ব্যবহার/ পরিবেশ সম্পর্কে অবগত)। আপনার রোগী কোথায় থাকবে, আপনি/ রোগীর সহযোগীরা কোথায় থাকবেন- সব আপনার বাজেট অনুযায়ী তারা সাধ্যমত ব্যবস্থা করে দিবে। আপনার যাবতীয় প্রয়োজন ( মোবাইলের সিম, ডলার কনভার্ট, ইত্যাদি) তারা ব্যবস্থা করে দিবে। আপনি চাইলে আগে থেকে গুগল ম্যাপ দেখে হোটেল/ গেস্ট হাউজ বুকিং করে রাখতে পারেন/ অথবা বুকিং করে রাখার জন্য হাসপাতাল/ সরাসরি হোটেল কর্তৃপক্ষকে মেইলও করতে পারেন। আপনি নিজেও দেখে হোটেল সিলেক্ট করতে পারেন। হাসপাতালের আশে-পাশেই প্রচুর হোটেল/ গেস্ট হাইজ আছে। ]
হাসপাতালে পৌছানোর পর পূর্বে এপয়ন্টমেন্ট থাকায় আমার বাবা’কে হাসপাতালে এডমিট করায়। যেহেতু টুইন শেয়ারিং তাই আমার মা’ও থেকে যান বাবা’র সাথে। আর ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আমার বাজেট অনুযায়ী আশে-পাশে হোটেল না পাওয়ায় হাসপাতাল একটু দূরে (১৫০ রুপী অটোতে আসা যাওয়া, ৩০ মিনিট) থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।

[ টিপস- হাসপাতালে অবশ্যই এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সেই সময়মত যাওয়া উচিত। কারণ আমার অভিজ্ঞতা বলে বেড সবসময় খালী থাকেনা। সেক্ষেত্রে আপনার মূল্যবান ২-৩ দিন সময় নষ্ট হবার সম্ভবনা থাকে। অবশ্য আপনি যদি রোগের ডায়গোনোসিস করতে যান এবং সেজন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া না লাগে সেটি ভিন্ন কথা। তবে ডায়গোনসিস শিডিউল ও আগে থেকে বুকিং করিয়ে যাওয়া উচিত।]

অপারেশনঃ

পরদিন বাবার অপারেশন হয়। দুপুর ৩ টায় অপারেশন থিয়েটারে নেয় রাত ৮ টায় শেষ হয় অপারেশন। চারটি বাইপাস হয়। অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করার পর আই.সি.ইউ’তে নেয়া হলে আমাদের একজনকে ডাকা হয় দেখবার জন্য। আইসিইউ তে যাবার পর ডাক্তার বলেন অপারেশন ভালো হয়েছে। আগামীকাল জ্ঞান ফিরবে। চিন্তার কারণ নেই। অবশেষে চিন্তামুক্ত হয়ে আমরা হোটেলে ফিরে আসি। উল্লেখ্য, আইসিইউ’তে কারো থাকার নিয়ম নেই। সুতরাং সেদিন এবং পরবর্তী তিন দিন আমার মা এবং আমি দুজনেই হোটেলে থাকি। এছাড়া অতিরিক্ত পেমেন্ট দিয়ে হসপিটালেও বেড এর ব্যবস্থা করা যায় থাকবার জন্য।

আইসিইউ’তে ৩ দিন থাকার পর বাবাকে বেড এ দেয়। সেখানে ৪ দিন থাকতে হয়েছিলো। এই ৪ দিন আমার মা সার্বক্ষনিক বাবা’র সাথে ছিলো। আমি সকালে গিয়ে সারাদিন হসপিটাল এ থেকে রাতে হোটেলে ফিরতাম। হসপিটালে থাকাকালীন রোগীর সব কিছুর দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। ঔষুধ, খাবার, ড্রেসিং সবকিছুই প্যাকেজে অর্ন্তভুক্ত। রোগীর কন্ডিশন বিবেচনায় আইসিইউ’তে অনেক সময় ২ দিন/ ৪দিনও রাখা হয়। ৮ দিন পর (অপারেশনের আগে ১ দিন + আইসিইউ ৩ দিন+ অপারেশনের পর ৪ দিন) রোগী (বাবা) এবং আমার মা হোটেলে আসে। এগুলো টিপিক্যাল হোটেল না। রোগী এবং তাদের আত্মীয়দের জন্যই এগুলো তৈরী। এগুলোর সাথে রান্নাঘর আছে। রোগীকে তো আর হোটেল এর খাবার খাওয়ানো সম্ভব না। তাই হোটেল এ এই ব্যবস্থা।রুম ভাড়া ছিলো প্রতিরাত্রে ১০০০ রুপী। মোটামুটি পরিচ্ছন্ন গেস্ট হাউস ছিলো। এসি, গীজার, ফ্রিজ, টিভি ছিলো। আমাদের হোটেলে আমি একটাই বাংলাদেশী ছিলাম। আর বাকীদের মধ্যে ছিলো – ইরাকী, ওমানী, রাশিয়ান, তুর্কেমিস্তানী, উজবেকিস্তানী ইত্যাদি। সবাই চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই আসে। আমরা হসপিটাল থেকে রিলিজ দেবার পরও আরো ৪ দিন হোটেল এ ছিলাম। প্রত্যেক বেলাতেই আমার মা রান্না করে। দিল্লীতে প্রত্যেক এলাকাতেই কমিউনিটি সেন্টার ( আমাদের দেশের অর্থে মুদি দোকান/ বাজার) থাকে। সুতরাং বাজার করা অত্যন্ত সহজ, এবং মোটামুটিই সব কিছুই পাওয়া যায়।

ডাক্তার অপারেশনের ৮ দিন পর সেলাই কাটার তারিখ দিয়েছিলো। কিন্তু আমার ছুটি না থাকায় – আমরা সিদ্ধান্ত নেই সেলাই বাংলাদেশে কাটবো। ডাক্তারকে আমাদের সমস্যার কথা জানালে তিনি সাথে সাথেই বলেন সেলাই বাংলাদেশেই কাটানো যাবে। আমরা সে অর্থে বাবা’কে হাসপাতাল থেকেই হোটেলে না গিয়ে সরাসরি দেশের ফ্লাইটে ঢাকায় নিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু তিনি শারীরিকভাবে সামর্থ্য না হওয়ায় আমরা কয়েকদিন (৪ দিন) রেস্ট নিয়ে দেশে ফিরি।

হসপিটাল মূল্যায়নঃ

# আমি বাইপাস চিকিৎসা’তে ফর্টিস এসকর্ট’কে ১০ এ ৯ দিবো। বিশেষ করে এত জটিল অপারেশন শেষ হবার সাথে সাথেই ডাক্তার যেভাবে আশ্বস্থ করেছিলেন যে কোন বড় সমস্যা নেই – তখন যে কি নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম তা সকলেরই বোধগম্য। পরবর্তীতে অত্যন্ত প্রশিক্ষিত নার্সদের পেশাদারিত্ব এবং যত্ন নেয়া আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছে।

# যে কোন সমস্যা শুধুমাত্র ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে জানালেই সমাধান হয়ে যায় (পুরাই ওয়ান স্টপ সল্যুশন এর মতো)। ওদের অন্তরিকতা প্রশংসনীয়। ওরা অত্যন্ত প্রফেশনাল। রোগীকে এবং রোগীদের আত্মীয় স্বজনরা যেনো সন্তুষ্ট হয়ে যেন পরবর্তীতে আবার আসে সেই চেষ্টাই এরা সবসময় করে।

# এরা যে প্যাকেজ আমাদের অফার করেছিলো তার থেকে ১ পয়সাও বেশী দাবী করেনি। বাইপাস অপারেশন এ ৩/৪ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন। সবই হসপিটাল নিজ দায়িত্বে ম্যানেজ করে। মূলত আমাদের দায়িত্ব ছিলো রোগী এবং প্যাকেজের অর্থ ওদের হাতে পর্যন্ত দিয়ে আসা। বাকী সবকিছুর মাথাব্যথা ওদের। এই জিনিসটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। আমাদের চিকিৎসা নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন হয় নি।

খরচ (আনুমানিক):

হাসপাতাল খরচ (৬০০০ ডলার প্যাকেজ)- ৪ লাখ রূপী
যাতায়াত (প্লেন, মোট ৩ জন)- ৬০ হাজার রূপী
হোটেল খরচ (১৪ দিন) – ১৩ হাজার রূপী
খাওয়া খরচ – ১০ হাজার রূপী
হসপিটালে যাতায়াত খরচ- ২ হাজার রূপী
পরবর্তী তিন মাসের ঔষুধ খরচ – ১০ হাজার রূপী
অন্যান্য (সিম+ মোবাইল বিল অন্যান্য)- ৫ হাজার রূপী
সর্বমোট – ৫ লাখ রূপী (৭৫০০ ডলার) = ৬ লাখ টাকা

আরো কিছু টিপসঃ

# দিল্লীর রিকশা, অটো, ট্যাক্সি ড্রাইভার ; দোকানদার, বাজার – সব কিছুর চরিত্র আমাদের দেশের মতনই। সবাই শুধু বেশী নিতে চায়। সুতরাং সব কিছুতে দামাদামী অবশ্যই করবেন। আমার হোটেল থেকে হসপিটালের অটো ভাড়া ছিলো ৭০ রুপী যা অটোওয়ালা’রা ১৫০/২০০ পর্যন্ত দাবী করতো (দিল্লীতে মিটারে কেউ যায় না!!)। আর কোথায় যাবেন তা অবশ্যই ঠিকমতো বলবেন এবং ভাড়া আগেই ঠিক করবেন। একটু বেশী গেলেই তারা অদ্ভূত ভাড়া দাবী করবে। একবার সরল বিশ্বাসে পূর্বনির্ধারিত জায়গায় না নেমে ১০ মিনিট দূরের এক জায়গায় নামি। অটো’ওয়ালা আমার কাছে ১০০ রূপী বেশী দাবী করে। হাসপাতাল/ হোটেল এর রিসিপশনে, সিকিউরিটি গার্ডদের কাছে যেকোন জায়গায় যাবার উপায়, যাতায়াত ভাড়া সব তথ্য ভালোভাবে জেনে নিন।

# যারা ঘোরাঘুরি করতে চান দিল্লী আদর্শ জায়গা। এবং ঘোরার জন্য আদর্শ সময় হচ্ছে রোগী যখন আইসিইউতে থাকে তখন। কারণ তখন ২৪ ঘন্টায় মাত্র দু’বার রোগীর সাথে দেখা করতে দেয়। দুপুর ১২ টায় ১৫ মিনিটের জন্য আর বিকেল ৬ টায় ১৫ মিনিটের জন্য (মাত্র ১ জনকে দেখা করতে দেয়)। সুতরাং আইসিইউ’তে রোগী থাকার তিন দিনে ঘুরে ফেলতে পারেন পুরো দিল্লী। আমি আর আমার মা এই তিন দিনে পুরো দিল্লী যতটুকু পারি ( কুতুব মিনার, লোটাস টেম্পল, হুমায়ুনস টম্ব, রেড ফোর্ট, জামে মসজিদ, পুরানো দিল্লী, চাদনী চক) ঘুরে নিয়েছিলাম।

# অবশ্যই প্যাকেজের থেকে যতটুকু পারা যায় ডলার বেশী নিয়ে যাবেন। কারণ অপারেশন সবসময় প্যাকেজ অনুযায়ী নাও হতে পারে। কমপ্লিকেশনস বেশী থাকলে খরচ বেড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। একজনের পাসপোর্টে ৫০০০ ডলার পর্যন্ত এন্ডোর্স করানো যায় ( তিন জন = সর্বোচ্চ ১৫০০০ হাজার ডলার)। তবে সব ডলার ক্যাশ নিয়ে যাবার থেকে ক্রেডিটকার্ডে নিয়ে যাওয়া কম ঝুকিপূর্ণ। অনেক ব্যাংক এখন ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিটকার্ড সরবরাহ করছে। আর ডলার ভাংগিয়ে রূপী করার জন্য দোকান আশেপাশেই অনেক থাকে।

# চেস্টা করবেন রোগী ভর্তি করানোর ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপারেশন করিয়ে ফেলতে (যদি রোগীর সব টেস্ট রিপোর্ট ঠিক থাকে, এবং তিনি যদি অপারেশন করানোর জন্য ফিট থাকেন)। অন্যথায় দেরী হয়ে প্যাকেজ সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলে চার্জ বেশী করবে (প্রতি দিন ৩৫০-৪০০ ডলার)। কারণ অপারেশন শেষ হবার পর একটা মিনিমাম সময় হসপিটালে থাকতেই হবে। এখন আপনি যদি ৩ দিন পর অপারেশন করান সেক্ষেত্রে প্যাকেজ বাকী থাকলো আর ৫ দিন। এই ৫ দিনে রোগী রিলিজ পাবার উপোযোগী নাও হতে পারেন। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত দিন থাকতে হবে। এই হিসাব মাথায় রেখে কর্তৃপক্ষকে (ডাক্তার/ ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক) একটু রিমাইন্ডার দিবেন।

# রোগীকে দেশে আনার সময় পরবর্তী তিন মাসের ঔষুধ কিনে আনলে ভালো হয়। ওদের ডাক্তাররা আমাদের দেশের মত প্রচুর ঔষুধ দেন না। যেমন আমার বাবা এখন মাত্র ৪টি ঔষুধ খাচ্ছে (যার মধ্যে দুটি ঔষুধ ২ বার এবং বাকী ২টি মাত্র ১ বার !!!!)।

# গুগল ম্যাপ ব্যবহার করা শিখুন। এর চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ নেই। দিল্লীর নতুন এক অটো ড্রাইভারকে আমি ইনডিয়া গেট থেকে আমার হোটেল- প্রায় ১০/১১ কিমি রাস্তা নিজে গুগল ম্যাপ দেখে ডিরেকশন দিতে দিতে নিয়ে এসেছি। গুগল ম্যাপ সম্পর্কে আইডিয়া থাকলে আপনি কখনই রাস্তা না চেনার বিপদে পড়বেন না। শুধু রাস্তা না, আশের পাশের খাবার দোকান, মেট্রো/ ট্রেনের শিডিউল যে কোন কিছু জানার জন্য গুগল ম্যাপের সাহায্য নিন।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Shares