Main Menu

আগামী ২রা সেপ্টেম্বর পবিত্র ঈদুল আজহা

+100%-

আগামীকাল পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। ইসলামী দিবসসমূহের মধ্যে এ দিনের তাৎপর্য অপরিসীম। আরবি ‘কোরবান’ থেকে কোরবানি শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ত্যাগের মাধ্যমে নৈকট্যলাভ। এদিনে পশু কোরবানির মাধ্যমে বান্দা আত্মত্যাগের নজির পেশ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ব্রতী হয়। ঈদের খুশীতে মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে দ্বীনি ভাবধারা বইয়ে চলে। ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও সহানুভূতির গভীর বন্ধনে শান্তির সুবাতাস নেমে আসে। ঈদের জমায়েতে পারস্পরিক সালাম, কোলাকুলি ও কুশল বিনিময়ে অকৃত্রিম আত্মীয়তা জমে উঠে। কোরবানির গোস্তের সুষম বণ্টন ও চামড়ার টাকা হাদিয়া পাওয়ার মাধ্যমে সমাজের দীনহীন অনাথ এতিম ও হতাশ শ্রেণী একদিনের জন্য হলেও নিজেদের অধিকার ফিরে পায়। সবাই সাম্যবাদের মর্মকথা হরহামেশা উচ্চারণ করলেও ঈদুল আজহা বা কোরবানির দিন তার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠে।

কোরআন হাদীসের অসংখ্য জায়গায় কোরবানির গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আল কুরআনের সবচে’ ছোট সূরা সূরায়ে আল কাওছারে ফরমায়েছেন ‘অতএব তুমি তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং কোরবানি কর।’ কোরবানি মনের ঐকান্তিক আগ্রহ ছাড়া কবুল হয় না। নিবেদিত প্রাণ, গভীর আন্তরিকতা ও ইসলামী শরীয়তের প্রতি অগাধ আস্থা সহকাওে কোরবানি পেশ করতে হবে।
পৃথিবীতে ধর্মকর্মের ইতিহাস যত প্রাচীন কোরবানির ইতিহাসও তেমনি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। মানব জাতির জন্য আল্লাহ পাকের তরফ প্রদত্ত সকল শরীয়তে কোরবানির হুকুম বিদ্যমান ছিল। সকল উম্মতের এ ছিল ইবাদতের এক অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির এক রীতিনীতি নির্ধারণ করেছি যেন তারা ঐ সব পশুর ওপর আল্লাহ পাকের নাম নিতে পারে যেসব তিনি তাদেরকে দান করেছেন’ ( সূরা হজ্জ –৩৪)।
কোরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা যায়, আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর সন্তান হাবিল ও কাবিল প্রথম কোরবানি করেন। তখনকার সময় প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যাসন্তান যমজ হিসেবে জন্মগ্রহণ করতো এবং তারা পরস্পরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারতো না। দেখা গেছে, হাবিলের সহোদর হিসেবে যে মেয়েটি ভূমিষ্ট হয় তা কাল ও বিশ্রী। আর কাবিলের সহোদর বোন খুবই রূপসী ও মায়াবতী। তখনকার শরীয়তের বিধান অনুসারে কাবিলকে হাবিলের সহজাত বোন আর হাবিলকে কাবিলের সহজাত বোন বিয়ে করতে হবে। এতে কাবিল রাজী না হওয়ায় বিবাদের সৃষ্টি হয়। অতঃপর উভয়ের পিতা হযরত আদম (আ.) হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার জন্য বললেন, ‘তোমরা উভয়ে সামর্থানুযায়ী আল্লাহ তা’য়ালার উদ্দেশ্যে কোরবানি পেশ কর, যার কোরবানি কবুল হবে সে কাবিলের সহজাত বোন রূপ–লাবণ্যে অনন্যা আকলিমাকে বিয়ে করতে পারবে’। এ ঘটনার সত্যায়নে আল্লাহ পাক আল কুরআনে ইরশাদ ফরমায়েছেন, ‘আর তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের ঘটনা শুনিয়ে দাও, যখন তারা দুই জনেই কোরবানি করলো, তখন তাদের একজনের কোরবানি কবুল হলো অপরজনের কোরবানি কবুল হলো না (সূরা মায়েদা – ২৭)।
আল কুরআনে হযরত ইবরাহীম (আ.)কে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হিসেবে ভূষিত করা হয়েছে আর কোরবানি তারই অন্যতম সুন্নত, আদর্শ। বর্তমানে আমাদের সমাজে যে কোরবানি প্রথা চালু আছে তার সাথে যে ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে তা আল কোরআনের সূরা আস্ সাফ্ফাতের ১০২–১১২ আয়াতে কারীমায় সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে, “যখন সে (ইসমাঈল আ.) তার সাথে চলাফেরার বয়সে পৌঁছলো তখন একদিন ইব্রাহীম (আ.) তাকে বললো : প্রিয় বৎস আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যেন জবেহ করছি। বল দেখি কি করা যায় ? পুত্র বিনা দ্বিধায় বললো, আব্বা, আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা শীঘ্রই পালন করুন। ইনশাল্লাহ, আপনি আমাকে অবিচল দেখতে পাবেন। অবশেষে পিতাপুত্র উভয়ে আল্লাহর কাছে নিজেদের সোপর্দ করলেন এবং ইবরাহীম (আ.) পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন (জবেহ করার জন্য )তখন আমরা তাকে আহ্বান করে বললাম, ইবরাহীম তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমরা সৎকর্মশীলদের এরূপ প্রতিদানই দিয়ে থাকি। বস্তুত: এ এক সুস্পষ্ট অগ্নিপরীক্ষা। আর আমরা বিরাট কোরবানি ফিদ্য়া স্বরূপ দিয়ে তাকে (ইসমাঈল আ.) উদ্ধার করেছি। আমরা ভবিষ্যতের উম্মতের জন্য ইবরাহীমের এ সুন্নাতকে স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহীম (আ.) এর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবে জীবনদানকারীদেরকে আমরা এ ধরনের প্রতিদানই দিয়ে থাকি। নিশ্চিত রূপে সে মুমিন বান্দাদের মধ্যে শামিল’।
তাফসীরে এসেছে, ‘হযরত ইবরাহীম (আ.) তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে জবেহ করতে বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ মনোরথ হলে ছুরি হাত থেকে ফেলে দেয়। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আ.) ঐশী প্রত্যাদেশে হযরত ইসমাঈল (আ.) এর বদলে কোরবানির জন্য একটি দুম্বা নিয়ে হাজির হলেন। পিতা ইব্রাহীম সে দুম্বা আল্লাহর রাহে কোরবানি প্রদান করলেন। পরবর্তীতে তারই ধারাবাহিকতায় আল্লাহর আদেশে মুসলিম মিল্লাত এ কোরবানি প্রথা অদ্যাবধি চালু রেখে আসছে। অধুনাকালে কোরবানি নিয়ে অমুসলিমদের পাশাপাশি অনেক মুনাফিকও পশুহত্যার অবান্তর ইস্যু সৃষ্টি করছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘কোরবানী’ শীর্ষক কালজয়ী কবিতায় কোরবানিকে পশু হত্যা নয়, সত্য প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের শুভ উদ্বোধন হিসেবে অভিহিত করে তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ঐ খুনের খুঁটিতে কল্যাণ–কেতু লক্ষ্য ঐ তোরণ, আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের পূত বোধন। ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন।
তাই কোরবানিকে আমাদের ধর্মীয় চেতনার উৎস এবং সকল কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে ছুরি চালানোর ভিত্তিমূল হিসেবে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে আল্লাহ পাকের নিয়ামতের শোকরগুজারি করাও আমাদের দায়িত্ব। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের মাঝে ঈমানী অনুভূতি জাগ্রত করে দিন। আমীন।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Shares