Main Menu

শিক্ষার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণাদায়ী নারী আশুগঞ্জের আমেনা খাতুন

+100%-

আমেনা খাতুন আশি নব্বই বছর পূর্বের আমাদের ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রগণ্য নারী। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিভাবান নারী। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল কম কিন্তু তার দূরদৃষ্টিসম্পূর্ণ চিন্তা ভাবনায় তিনি ছিলেন বিরল। সে যুগে গ্রাম্য বিদ্যালয়ে যুতটুকু পড়ালেখা শিখে ছিলেন তাতে সুশিক্ষা অর্জন করেন। এই মহীয়সী নারী নারীদের অধিকারের কথা চিন্তা করে সামাজিক কুসংস্কার থেকে নারীদের রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি শিক্ষার আলো ছড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা বিস্তারে কাজ করেছেন। আমাদের গ্রামে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে।

প্রথিতযশা এই মহান শিক্ষিকা ১৯১২ সালে ১লা জানুয়ারি বর্তমান জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার নাওঘাট গ্রামে সম্ভ্রান্ত এক ধার্মিক মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর নানা এবং দাদার উভয় বাড়ি অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিল। তিনিও নিয়মিত নামাজ,রোজা- ইবাদত বন্দেগী করতেন। তখনকার দিনে মুসলিম পরিবারের মেয়েরা যেভাবে পর্দানশীন ছিলেন তিনিও সে ভাবেই চলতেন।

বাবা চান্দ আলী মুন্সি পিতৃক সূত্রে বিষয় সম্পত্তির অধিকারী সৌখিন ও বিত্তশালী লোক ছিলেন। মা আলতাফুন নেছা ছিলেন অন্য দশ জন নারীর মতোই সাধারণ গৃহিণী। আমেনা খাতুন নাওঘাট গ্রামের ঐতিহ্যশীল বংশ ভূঁইয়া পরিবারের সন্তান আব্দুর রউফ ভূঁইয়া সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দাম্পত্যে জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অসীম সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আব্দুর রউফ ভূঁইয়া একজন শিক্ষানুরাগী ও মানব দরদি ব্যক্তি ছিলেন। তিনি অসহায় দুঃস্থ মানুষের সুখ-দুঃখে সহমর্মিতার সাথে সহসায় এগিয়ে আসতেন পাশাপাশি তিনি তাঁর সহধর্মিনীকে সব সময় সহযোগীতা করতেন। স্বামীর সহযোগীতায় আমেনা খাতুন গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ভাবে কাজ করছেন। পারিবারিক জীবনেও তিনি সুখী ছিলেন। তাঁদের সব সন্তানকে শিক্ষা-দীক্ষায় সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলেন। তারা প্রায় সকলেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

তাঁর সন্তানদের মধ্যে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের ভূতপূর্ব উপাচার্য্য প্রফেসর ড. জহিরুল হক ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া (এফসিএ), মোঃ সানাউল হক ভূঁইয়া এবং পুত্রবধূ ব্যারিস্টার রাবিয়া ভূঁইয়া আমাদের দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আইন অঙ্গনে অত্যান্ত সুপরিচিত। নাতি-নাতনিরাও পূর্বসূরিদের ধারাহিকতায় দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

নারী মুক্তির আন্দোলনের প্রেরণা এই মহীয়সী নারী নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্টের গুণে সবার কাছে গুণী নারীর মর্যাদা লাভ করেন। তিনি কিছুটা সচেতনভাবে সেকালে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্যেই আমেনা খাতুন শিক্ষাপ্রতিম ছিলেন। তাই তিনি শিক্ষকতা পেশায় ব্রতী হন। বিংশ শতাব্দির শুরুতে গ্রামে প্রথম যে স্কুল (বর্তমানে নাওঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়)’টি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এই স্কুলের প্রথম নারী শিক্ষিকা ছিলেন তিনি। তারপূর্বে আশুগঞ্জ তো বটেই সম্ভবত মহকুমা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরেও আর কোন নারী শিক্ষকতা করে নি। তৃণমূলের এই মহীয়সী নারী আমেনা খাতুনকে নারী জাগরণীর অগ্রদূতী বেগম রোকেয়ার ভাবশিষ্য বলা যায়। তার চিন্তা-ভাবনা, পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলতি অবিকল বেগম রোকেয়ার মতোই ছিল। নারী অধিকার সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তিনি অশিক্ষার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেন। নারী সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন অভিশাপ্ত অশিক্ষার, দুঃখ-দুর্দশা উপলব্দি করে গ্রামের নারীদের শিক্ষা দিক্ষায় অগ্রসরে এগিয়ে আসেন। তৎকালীন সময় নাওঘাট গ্রামে একটা বিদ্যালয় ছিল; এই বিদ্যালয়ে মেয়েদের পড়ালেখার মতো তেমন কোন পরিবেশ ছিল না। তাছাড়া সে সময়টাতে মেয়েরা পড়ালেখা করতে পারত না; তখকার দিনে অবস্থাশীল পরিবারে সন্তানরা গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ালেখা করত। নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর আর্থিক দৈন্যদশার কারণে তাদের সন্তানেরা শিক্ষা বঞ্চিত ছিল। ধর্মের নানা দোহাইয়ে পুুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা ছিল ঘর বন্দি। এটা ছিল আমেনা খাতুনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত পীড়াদায়ক। সেই অন্ধকার নারী বন্দিদশা যুগে তিনি ছিলেন নারী প্রগতির দিশারী। ধর্মীয় গোড়ামি আর সংকীর্ণতার কারণে তখন নারী শিক্ষার বিকাশ ঘটানো সম্ভব ছিল না। এমন কঠিন পরিস্থিতে ধর্মীয় গোড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার ভেদ করে নারীদের শিক্ষা গ্রহনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় নারী শিক্ষিকার অভাবে নারী শিক্ষা প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই মহীয়সী নারী তখন নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নারীদের পাঠ্যদান দিতে থাকেন। নারী বান্ধব শিক্ষানুরাগী এই নারী যে সময়টাতে মেয়েদের পাঠ্যদান দিতে এগিয়ে আসেন: ঐ সময়টা নারীদের জন্য মোটেও অনুকুল পরিবেশ ছিল না। তখনকার সময় নারীদের পড়ালেখা করা তো দূরের কথা; ঘর থেকে বাহিরে বের হওয়াটাই ছিল রীতিমত যুদ্ধ ঘোষনার সামিল। এমন এক কঠিন পরিস্থিতে নারীদের জন্য আমেনা খাতুন গ্রামের মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা পাঠ দিতে শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতেন। তাকে দেখে মেয়েরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের নারী ও শিশুদের তিনি পড়াতেন। মতৃসম, মায়া- মমতা দিয়ে ছাত্রীদের হাতে কলমে পড়ানোর জন্য শিক্ষিকা হিসেবে তাঁর ছাত্রীদের কাছে তিনি অত্যান্ত প্রিয় ছিলেন। আমেনা খাতুন নাওঘাট স্কুল সংলগ্ন বাবার বাড়িতে গত শতাব্দীর ত্রিশ দশকের শেষভাগে নিজের উদ্যোগে একটি লাইব্রেরী করেছিলেন। মেয়ের এমন আগ্রহ দেখে শিক্ষানুরাগী বাবা চান্দ আলী মুন্সিও সহযোগীতা করেছিলেন। সেই সময় বই অনুরাগী ছেলে-মেয়েরা পাঠাগার থেকে বই পাঠের সুযোগ পেয়েছিল। শুধু তাই নয়; এই মহীয়সী নারী গ্রামের বাড়ি বাড়ি বই পৌছে দিতেন। বিশেষ করে শিশুদের লেখাপড়ার জন্য আগ্রহী করতে আরবী শিক্ষা, আদর্শলিপি, বাল্যশিক্ষা ও ছড়ার বইয়ের সাথে মায়েদের জন্য ইসলামিক বই, ছোট গল্প, উপন্যাসের বই পাঠাতেন। তার এমন উদ্যোগ মানুষের কাছে কৌতুহল তৈরির পাশাপাশি আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। শিক্ষয়িত্রীদের জন্য তিনি যে স্কুলটি চালু করে ছিলেন; তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। পরবর্তীতে নাওঘাট মডেল স্কুলে ছেলে-মেয়েদের একসাথে পড়ালেখা সুযোগ তৈরি হয়। আমাদের অঞ্চলে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল দৃষ্টান্তস্বরূপ। যা বন্দীবাসিনী নারী সমাজকে আজও আলোর পথ দেখাচ্ছে।

লেখক: লোক-সাহিত্যনুরাগী, রাজনীতিক কর্মী ও সংগঠক